

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই বিশ্বজুড়ে এক উৎসবের আমেজ। ধর্ম-বর্ণ, রাজনীতি বা অর্থনৈতিক সংকট ভুলে মানুষ এক কাতারে এসে দাঁড়ায় শুধু ফুটবলের টানে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও আমরা সেই একই উন্মাদনা দেখছি।
কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার পাশাপাশি এমন কিছু ঘটনা পাওয়া যায়, যা আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ তেমনই এক মর্মান্তিক স্মৃতি বহন করছে।
সেই ট্র্যাজেডির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কলম্বিয়ার এক শান্তশিষ্ট ফুটবলার- আন্দ্রেস এস্কোবার।
১৯৬৭ সালের ১৩ মার্চ কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে জন্ম এস্কোবারের। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, শৃঙ্খলাপরায়ণ আর ফুটবলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ।
পাড়ার ধুলোমাখা মাঠ থেকে শুরু করে পেশাদার ক্লাব 'আতলেতিকো নাসিওনাল'-এ নিজের জায়গা করে নেন তিনি। অসাধারণ ট্যাকলিং আর নেতৃত্বের গুণে খুব দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য এক ডিফেন্ডার।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে শক্তিশালী কলম্বিয়াকে নিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু এই স্বপ্নের টুর্নামেন্টই এস্কোবারের জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুলবশত নিজের জালেই বল জড়িয়ে (আত্মঘাতী গোল) বসেন তিনি।
ম্যাচটি ২-১ গোলে হেরে কলম্বিয়া বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। ফুটবলে এমন ভুল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু এই একটি ভুলই তার জীবনের মোড় ভয়াবহভাবে ঘুরিয়ে দেয়।
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর দেশে ফিরে এস্কোবার চরম ক্ষোভ আর আক্রোশের শিকার হন। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ দিন পর, ১৯৯৪ সালের ২ জুলাই মেডেলিন শহরের একটি নাইটক্লাবের বাইরে তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘাতকরা প্রতিটি গুলি ছোড়ার সময় উল্লাসে ‘গোল’ বলে চিৎকার করছিল! যেন মাঠের একটি সাধারণ ভুলের শাস্তি হিসেবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।
পরবর্তীতে এক মাদকচক্রের দেহরক্ষী এই হত্যার দায় স্বীকার করে, যদিও ৪৩ বছরের সাজা পেলেও মাত্র ১১ বছর পরই সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যায়।
আন্দ্রেস এস্কোবারের মৃত্যু শুধু একজন খেলোয়াড়ের মৃত্যু নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়গুলোর একটি। এই ঘটনার পর খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে সারা বিশ্ব নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
কলম্বিয়ার মানুষ আজও তাকে ‘এল কাবাল্লেরো দেল ফুটবল’ বা ‘ফুটবলের ভদ্রলোক’ হিসেবে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, তার কবরে ফুল দিয়ে যায়।
তার এই মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের বারবার একটি বার্তাই দিয়ে যায়- খেলাধুলা শুধুমাত্র আনন্দের জন্য, এটি কখনোই জীবন-মৃত্যুর কারণ বা ঘৃণার হাতিয়ার হতে পারে না।
