সোমবার
০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

খালেদা জিয়ার লাগানো কাঁঠালিচাঁপার গাছে হাসিনার কোপ

সৈয়দ আবদাল আহমদ
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১৪ পিএম
ছবি: এনপিবি নিউজ
expand
ছবি: এনপিবি নিউজ

কাঁঠালিচাঁপা খালেদা জিয়ার প্রিয় ফুল। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাঁঠালিচাঁপার একটি গাছ লাগিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা জেনে খালেদা জিয়ার লাগানো কাঁঠালিচাঁপার গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়ে নিজ কার্যালয়ে এসে এই ঘটনা জেনে খালেদা জিয়া মর্মাহত হয়েছিলেন।

যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানের কাছে তিনি তার এই দুঃখের কথা জানিয়েছিলেন।

বৃহস্পতিবার তেজগাঁও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে ঘটনাটি অনুসন্ধান করেছি। কাঁঠালিচাঁপার গাছটি সেখানে দেখতে পাইনি।

কাঁঠালিচাঁপার গাছটির পাশেই ছিল স্বর্ণচাঁপার গাছ, সেটি অবশ্য আছে। গাছটি লাগিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন মুখ্যসচিব।

১৯৯১-৯৬ সালে খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন তার উপ-প্রেস সচিব হিসেবে দৈনিক বাংলা থেকে লিয়েনে সেই অফিসে কর্মরত ছিলাম। কোনো এক বৃক্ষরোপণ সপ্তাহে তিনি কাঁঠালিচাঁপার গাছটি লাগিয়েছিলেন।

এ সময় আমরা যারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মকর্তা ছিলাম, মুখ্য সচিব গোলাম রব্বানী, সচিব ড. কামাল সিদ্দিকীসহ সবাই আমরা একটি করে গাছ লাগিয়েছিলাম।

বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার রাতে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানের বাসায় তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি লন্ডন থেকে দেশে এসে আবার সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকা বের করেছিলেন।

১৯৯২ সালের পর একদিন তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে খালেদা জিয়ার সামনে চেয়ারে বসলে একটি মিষ্টি ম-ম গন্ধ তার নাকে আসে।

শফিক রেহমান বলেন- ম্যাডামকে জিজ্ঞাসা করি, খুব একটা মজার গন্ধ পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী অমায়িক হাসিতে জানান, ওই দেখুন আপনার সামনেই আছে কাঁঠালিচাঁপা। এই গন্ধ ওই ফুলের।

একটি কাচের পাত্রে পানিতে হলুদ রঙের কাঁঠালিচাঁপার বেশ কয়েকটি পাপড়ি দেখতে পেলাম। এরপর থেকে খালেদা জিয়ার জন্মদিনে আমি কাঁঠালিচাঁপার ফুল সংগ্রহ করে তাকে উপহার দিয়ে এসেছি।

২০০১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার পর খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলে তার সঙ্গে প্রথম আমি সাক্ষাৎ করি।

তার জন্য নিয়ে যাই কাঁঠালিচাঁপা ও বকুল ফুল। ফুলগুলো যাতে দেখা না যায়, প্যাকেট করে নিয়ে গিয়েছিলাম।

টেবিলে রেখে ম্যাডামকে বললাম প্যাকেটটি খুলুন। তিনি প্যাকেট খুলে দেখতে পেলেন কাঁঠালিচাঁপা ফুল।

অন্য সময় আমি দেখেছি, কাঁঠালিচাঁপা ফুল পেয়ে তিনি খুব উৎফুল্ল হতেন। কিন্তু এবার তার চেহারা বিষণ্ণ। দ্বিতীয় প্যাকেটটিও খুলতে বললাম।

তিনি খুলে দেখলেন সেটি বকুল ফুল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আজ আপনাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? তিনি দুঃখ করে আমাকে বললেন, ‘কথাটি শুনলে আপনিও দুঃখ পাবেন।

আমি শখ করে গত মেয়াদে আমার অফিসের সামনে কাঁঠালিচাঁপার গাছ লাগিয়েছিলাম। কিন্তু শেখ হাসিন সেই গাছটি কেটে ফেলেন।’ এই ফুল গাছটি ওনার কী ক্ষতি করেছে, গাছটির প্রতি প্রতিহিংসা না দেখালে কি হতো না?

এরপর ম্যাডাম আমার কাছে জানতে চান, বকুল ফুল আনার রহস্য কী? আমি তাকে জানালাম, ‘কাঁঠালিচাঁপা যেমন আপনার প্রিয় ফুল তেমনি বকুল আমার প্রিয় ফুল।’

প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার ও দ্বিতীয় মেয়াদে সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন শামসুল আলম।

তিনি জানান, অফিসে ম্যাডাম আসার আগেই আমরা তার কক্ষে কাচের পাত্রে কাঁঠালিচাঁপা ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজিয়ে রাখতাম। আর ফুলদানিতে থাকত গোলাপ ও রজনীগন্ধা।

বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানার জন্য গেলে তিনি ওই অফিসের আরবোরিকালচারের একজন কর্মকর্তাকে ডেকে আনেন।

তিনি আমাকে নিয়ে গাছগাছালি ও ফুলের চত্বরে যান। তিনি আমাকে জানান, সেই সময়কার মালি ও আরবোরিকালচারের কর্মকর্তারা অবসরে চলে গেছেন। তিনি এখানে নতুন।

তবে কাঁঠালিচাঁপার গাছটি কাটার বিষয়টি তারা শুনেছেন। কাঁঠালিচাঁপা সম্পর্কে তিনি বলেন, কাঁঠালিচাঁপা ফুলের পাপড়ি সাধারণত ছয় থেকে বারোটি হয়। ফোটার সময় ‍ফুলটি সবুজাভ বা হালকা সবুজ রঙের থাকে এবং ধীরে ধীরে হলুদ ও সোনালি হলুদ রঙ ধারণ করে।

ফুলের গন্ধটা খুবই মিষ্টি। কাঁঠাল এবং চাঁপা ফুলের গন্ধের মিশ্রণে এই মিষ্টি গন্ধ হওয়ায় আমাদের দেশে এর নাম কাঁঠালিচাঁপা। কবি আল মাহমুদের ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতায় আছে কাঁঠালিচাঁপার কথা।

‘আম্মু বলেন পড়রে সোনা, আব্বু বলেন মন দে। পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে’।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের আরবোরিকালচারের ওই কর্মকর্তা আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার লাগানো ঔষধি বাগান দেখাতে নিয়ে যান। বাগানে দেখতে পাই ২০০২ সালের ১৯ আগস্ট (৪ ভাদ্র ১৪০৯) ‘বনাশ্রম’ শিরোনামে খালেদা জিয়ার দেওয়া ভিত্তিপ্রস্তর।

বাগানটি দেখে মনে হয়েছে, শেখ হাসিনা হয়তো এই বাগানের কথা জানতেন না। নইলে এ বাগানও হয়তো প্রতিহিংসার শিকার হতো!

সার্ক শীর্ষ সম্মেলন (১০ এপ্রিল, ১৯৯৩) উপলক্ষে সার্কের ৭ শীর্ষ নেতা একসঙ্গে লাগিয়েছিলেন বকুল ফুলের গাছ। সেটিও আছে।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে আছে ৬ প্রজাতির ১০৫টি ঔষধি গাছের এই বাগান। বর্তমানে এই বাগানে ফলদ, বনজ, ঔষধি, শোভাবর্ধন, মসলাসহ ৮৫ প্রজাতির ৮২৯টি গাছ আছে।

সব রকম মৌসুমি ফুলও আছে। এর মধ্যে মেগনোলিয়া, হৈমন্তী, গাঁদা, নয়নতারা, কসমস, বার্ড অফ প্যারাডাইস, সালভিয়া ইত্যাদি। গোলাপ-রজনীগন্ধা আর স্বর্ণলতার ঝাড় তো আছেই।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন