

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর অল্প কয়েকদিন বাকি থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় থাকা নেতাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করাতে পারেনি বিএনপি।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছেন- এমন অন্তত ৭১ জনকে বহিষ্কার করেও নির্বাচনি লড়াই থেকে বিরত রাখা যায়নি।
বরং এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশ কিছু জায়গায় দলের মনোনীত প্রার্থীদেরই ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন বলে দলের ভেতরেই আলোচনা আছে।
কোনো কোনো এলাকায় বিএনপির একাধিক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। আবার ভিন্ন দলের যেসব নেতাকে দলটি দলীয়ভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাদেরও অনেকে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই এসব নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করছেন।
আবার দলের মনোনয়ন চেয়ে পাননি, কিন্তু দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেও দাঁড়াননি- এমন নেতাদের নিয়েও বিএনপিতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও দলের শীর্ষ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে তাদের কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে এসে দলের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় হতে শুরু করেছেন।
বিএনপির নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নেতা বলেছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পর থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয় করার তৎপরতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুর কবির রিজভী বলছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা নির্বাচন করছেন, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এসব প্রার্থীদের কারণে বিএনপির কোনো সমস্যা হবে না।
একজন বিশ্লেষক বলছেন, যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিদ্রোহী তকমা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা বিজয়ী হবেন তারা বিএনপিতেই ফিরে আসা নিয়ে সংশয় নেই বলেই বিএনপির মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ কম বলে মনে হচ্ছে।
এখনো কত বিদ্রোহী বিএনপিতে
বিএনপির দফতর বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যেসব নেতা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এমন অন্তত ৭১ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং অন্তত ৭৫টি সংসদীয় আসনে দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
এখন তাদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন, যা দলীয় প্রার্থীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আবার দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশত নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে দলটি।
নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় যাদের বিএনপি বহিষ্কার করেছে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু সাবেক সংসদ সদস্য এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের অনেকেই এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
বিশেষ করে এই নির্বাচনের জন্য বিএনপি সমমনা অন্য দলের যাদের সমর্থন দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই এ ধরনের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকা বেশ কিছু নেতার সঙ্গে আলোচনা করা হলেও তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হননি। বরং তারা দলীয় হাই কমান্ডকে জানিয়েছেন যে, জিতলেও তারা শেষ পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গেই থাকবেন।
এখন তাহলে বিএনপির চিন্তা কী?
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুর কবির রিজভী বলছেন, এখন তারা (বিএনপি) মনে করছেন যে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, দলীয় প্রার্থীদের এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে দলের নেতাকর্মীরা এখন দলের মনোনীত কিংবা সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তারাই বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আশা করছি নির্বাচনে তারই প্রতিফলন ঘটবে।’
বিএনপি নেতারা মুখে এমন কথা বললেও বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন বলে আলোচনা আছে দলের ভেতরেই। কারণ দলটির কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ইতোমধ্যেই নির্বাচনি সভা সমাবেশের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা নির্বাচনি সমাবেশে প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, কেন্দ্র (বিএনপি) থেকে ডেকে নিয়ে তাকে নির্বাচন না করার জন্য বলা হয়েছিলে। তার আসনে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে।
আবার পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে বিএনপি সমর্থন দিলেও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির হাসান মামুন। এক সমাবেশে নুর এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসান মামুনকে দুইবার ডেকে নিয়ে আলোচনা করেছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, কিন্তু তিনি কথা শোনেননি।
বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি নির্বাচনি সমাবেশে বলেছেন, জয়ী হয়ে আসনটি ‘তারেক রহমানকে উপহার দেবেন’।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি রেজাউল করিম খান চুন্নু এবং কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাদের বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
নাটোর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম আনুর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন জেলা শাখার বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক দাউদার মাহমুদ। পাবনা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু।
শেরপুর-১ বিএনপির সানসিলা জেব্রিন প্রিয়াঙ্কার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন দলের জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তাকেও বহিষ্কার করেছে বিএনপি। হবিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন দলটির জেলা শাখার বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ সুজাত মিয়া।
এর বাইরে নড়াইল বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল এবং চান্দিনা উপজেলা বিএনপি সভাপতি আতিকুল আলম শাওনসহ ৫৯ জনকে প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে গত ২১ জানুয়ারি বহিষ্কার করা হয়েছিল।
এই তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যও আছেন। আবার মনোনয়ন পাননি কিন্তু নির্বাচনেও দাঁড়াননি, এমন কিছু নেতাকে নিয়েও দলের মনোনীত প্রার্থীর উদ্বেগ ছিল।
ঢাকায় ববি হাজ্জাজকে দলে ভিড়িয়ে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ঢাকা-১৩ আসনে এর আগে দলটির প্রার্থী ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। সেখানে আলাল ও তার সমর্থকদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন ববি হাজ্জাজ।
ঢাকা-১৫ আসনে সবসময় আলোচনায় থেকেও মনোনয়ন পাননি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান। ফলে তার সমর্থকদের সক্রিয় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মিল্টনের জন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, বিএনপির দিক থেকে শক্ত বার্তা যায়নি বলেই এত বিপুল সংখ্যক আসনে বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
তিনি বলেন, সব জায়গায় বিএনপি যোগ্য প্রার্থী দিতে পেরেছি কি না, সেই প্রশ্ন আছে। কিছু এলাকায় জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিত কিছু নেতাকে দলটি মনোনয়ন দেয়নি। আবার শরিক দলকে যেখানে সমর্থন দিয়েছেন, সেখানে দলের নেতাদের কনভিন্স করেনি। তারা হয়তো ভাবছে সবাই তো বিএনপিরই।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন