

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ এবং যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংয়ে এ অনুরোধ করেন তিনি।
যৌথ ব্রিফিংয়ে শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে কয়েকটি শুভেচ্ছা ফোনকল পেয়েছিলাম, তার একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে।
তিনি আমাকে অভিনন্দন জানান এবং মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান। তার সেই আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। আমার স্ত্রী এবং আমি আনন্দিত যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি আমার প্রথম বিদেশ সফর এবং আমরা মালয়েশিতে এসেছি।
মালয়েশিয়ায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সফরের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমার স্মরণে আছে, আমার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন।
সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করে এবং শ্রমশক্তি সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করে। আমার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ১৯৯৩ সালে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। তার সেই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং আমি আজ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি। আমরা দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যুতে মতবিনিময় করেছি। আজ আমরা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি।
যৌথ কমিশনের বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক পরামর্শের মতো বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা আরও বাড়াতে আমরা একমত হয়েছি। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী জনসমর্থন লাভ করেছে। জনগণের বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি।
আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমি মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের সেই সুযোগগুলো কাজে লাগানোর আন্তরিক আহ্বান জানাই।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আলোচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্য সংযোজিত খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত ও অধ্যয়নরত বাংলাদেশী শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা আমাদের দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অবদান দুই দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ এবং যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছি।
তিনি বলেন, পাশাপাশি, অনিয়মিত অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশীদের সম্ভব হলে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টিও আমি তার কাছে উত্থাপন করেছি। আমরা একমত হয়েছি যে, কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং কর্মীদের ব্যয়ও হ্রাস পায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে আমি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাই।
তিনি বলেন, আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। একই সঙ্গে আমরা আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (RCEP)-এ যোগদানে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সংযুক্তির প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয়েও মতবিনিময় করেছি। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন দেয়ায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানাই। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে ভবিষ্যতেও আমাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যে দ্বিপাক্ষিক দলিলগুলো স্বাক্ষর ও বিনিময় হয়েছে, আমি তা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এসব উদ্যোগ আমাদের সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক গতিশীলতা বজায় রাখবে।
তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমরা যৌথ সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।