

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


শরীর দুর্বল লাগলেই অনেকে ধরে নেন, হয়তো ভিটামিন বা ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয়েছে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম কিংবা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করেন। পরিচিতজনের পরামর্শেও অনেকে একই কাজ করেন।
তবে দুর্বলতা মানেই শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি—এমন ধারণা ঠিক নয়। শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। তাই কারণ না জেনে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।
দুর্বলতার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি যেমন থাকতে পারে, তেমনি বিভিন্ন অসুস্থতাও এর কারণ হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, মানসিক চাপ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কিছু রোগের কারণেও শরীরে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে দুর্বলতার সঙ্গে যদি হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকে, তাহলে কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। শুধু ভিটামিন খেয়ে উপসর্গ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে মূল সমস্যাটি শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।
ভিটামিন ও খনিজ উপাদান শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্রহণ করলেও সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
অতিরিক্ত কোনো কোনো ভিটামিন বা খনিজ গ্রহণের ফলে বমি বমি ভাব, ক্ষুধামান্দ্য, পেটের সমস্যা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা অন্যান্য শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট কিডনি বা লিভারের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই দুর্বলতা অনুভব করলেই ফার্মেসি থেকে ভিটামিন কিনে খাওয়া নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
শরীরব্যথা বা দুর্বলতা হলেই অনেকে ক্যালসিয়াম খেতে শুরু করেন। কিন্তু সবার জন্য অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজনের বেশি ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনিতে পাথরসহ বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি দীর্ঘদিন নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা ব্যক্তির বয়স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া হলেই আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করা ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের অ্যানিমিয়ার কারণ আয়রনের ঘাটতি নয়। আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন দিতে পারেন।
আবার আয়রন গ্রহণের সময়ও কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। কিছু খাবার বা ওষুধের সঙ্গে একসঙ্গে গ্রহণ করলে আয়রন শরীরে শোষিত হওয়ার মাত্রা কমতে পারে। তাই আয়রন সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে। যেমন নির্দিষ্ট হাড়ের সমস্যা, বয়সজনিত ঝুঁকি বা পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শরীরের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সুষম খাবার থেকেই পাওয়া সম্ভব। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ বা উপযুক্ত বিকল্প এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা জরুরি।
শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলেও পুষ্টির ঘাটতি হচ্ছে কি না, তা প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।
দুর্বলতা কয়েক দিন ধরে থাকলে বা ক্রমেই বাড়তে থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে দুর্বলতার সঙ্গে হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিন জ্বর বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, ভিটামিন ও খনিজ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করাই নিরাপদ। দুর্বলতা হলেই ভিটামিনের ঘাটতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঠিক কারণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


