


থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং বিভিন্ন হরমোনগত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থিতে প্রদাহ দেখা দিলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে থাইরয়েডাইটিস বলা হয়। বিভিন্ন কারণে থাইরয়েডাইটিস হতে পারে এবং এর ফলে থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। কখনও এটি থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি (হাইপোথাইরয়েডিজম), আবার কখনও অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদনের (হাইপারথাইরয়েডিজম) কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েডাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অটোইমিউন সমস্যা। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েড গ্রন্থিকেই আক্রমণ করে।
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে যখন প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি হরমোন তৈরি হয়, তখনই থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দেয়। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত থাইরয়েড গ্রন্থিকে আক্রমণ করা (অটোইমিউন ডিজিজ), খাবারে আয়োডিনের অভাব বা আধিক্য, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বংশগত বা জিনগত কারণ এবং থাইরয়েড গ্রন্থিতে কোনো ধরনের সংক্রমণ বা টিউমার হওয়া।
হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস এ ধরনের রোগের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এছাড়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং পরিবেশগত কিছু কারণও থাইরয়েডাইটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে ৩০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। যাদের পরিবারে অটোইমিউন রোগের ইতিহাস রয়েছে কিংবা যারা লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত, তাদের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
থাইরয়েডাইটিসের লক্ষণ রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা, ঠান্ডা বা গরমের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং গলায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। অনেক রোগী মনোযোগের ঘাটতি বা স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও অনুভব করেন।
পিরিয়ডের অনিয়ম হওয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করা।
হুট করে ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া এবং চুল পড়া।
পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং শারীরিক ও যৌনক্ষমতা বা ইচ্ছা কমে যাওয়া।
মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অনিদ্রা এবং চুল পেকে বা ঝরে টাক পড়া।
তবে কিছু লক্ষণকে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন তীব্র ঘাড়ব্যথা, গলায় ফোলাভাব, শ্বাস নিতে বা খাবার গিলতে সমস্যা, দ্রুত হৃদস্পন্দন, প্রচণ্ড জ্বর কিংবা কাঁপুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
থাইরয়েডাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা ইতিহাস মূল্যায়ন করেন। এরপর সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড হরমোন এবং থাইরয়েড-উত্তেজক হরমোন (TSH) এর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
অটোইমিউন সমস্যার সন্দেহ হলে বিশেষ অ্যান্টিবডি পরীক্ষাও করা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার ও অবস্থা বোঝার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষারও প্রয়োজন হয়।
রোগের কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী থাইরয়েডাইটিসের চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। যদি থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হিসেবে লেভোথাইরক্সিনের মতো ওষুধ ব্যবহার করা হয়। প্রদাহ ও ব্যথা কমানোর জন্য অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধ বা প্রয়োজনে কর্টিকোস্টেরয়েডও দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আয়োডিন, সেলেনিয়াম ও জিঙ্কসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকাও রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, চর্বিহীন মাংস, টকদই, এবং বিভিন্ন রকমের বাদাম ও বীজ রাখুন।
অন্যদিকে, থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, মুলা ও সয়াবিন জাতীয় খাবার অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাকুন (তবে ভালো করে রান্না করে অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে)।
এছাড়া অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত বা প্যাকেটজাত খাবার, ফাস্টফুড এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা-কফি) পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই ভালো।
চিকিৎসা না করলে থাইরয়েডাইটিস দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতার কারণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজম, গলগন্ড এবং বিরল ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ‘থাইরয়েড স্টর্ম’-এর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই থাইরয়েডের যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।