

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


থাইরয়েডাইটিস কি?
থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং বিভিন্ন হরমোনগত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থিতে প্রদাহ দেখা দিলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে থাইরয়েডাইটিস বলা হয়। বিভিন্ন কারণে থাইরয়েডাইটিস হতে পারে এবং এর ফলে থাইরয়েড গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। কখনও এটি থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি (হাইপোথাইরয়েডিজম), আবার কখনও অতিরিক্ত হরমোন উৎপাদনের (হাইপারথাইরয়েডিজম) কারণ হতে পারে।
কখন মানুষ থাইরয়েডাইটিসে আক্রান্ত হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েডাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অটোইমিউন সমস্যা। এ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাইরয়েড গ্রন্থিকেই আক্রমণ করে।
হাশিমোটোর থাইরয়েডাইটিস এ ধরনের রোগের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এছাড়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং পরিবেশগত কিছু কারণও থাইরয়েডাইটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কারা বেশি থাইরয়েডাইটিস এ আক্রান্ত হয়?
নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে ৩০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। যাদের পরিবারে অটোইমিউন রোগের ইতিহাস রয়েছে কিংবা যারা লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগে আক্রান্ত, তাদের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
থাইরয়েডাইটিসের লক্ষণ ও সতর্কতা
থাইরয়েডাইটিসের লক্ষণ রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা, ঠান্ডা বা গরমের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এবং গলায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। অনেক রোগী মনোযোগের ঘাটতি বা স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও অনুভব করেন।
তবে কিছু লক্ষণকে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন তীব্র ঘাড়ব্যথা, গলায় ফোলাভাব, শ্বাস নিতে বা খাবার গিলতে সমস্যা, দ্রুত হৃদস্পন্দন, প্রচণ্ড জ্বর কিংবা কাঁপুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
থাইরয়েডাইটিসের চিকিৎসা পদ্ধতি
থাইরয়েডাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা ইতিহাস মূল্যায়ন করেন। এরপর সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড হরমোন এবং থাইরয়েড-উত্তেজক হরমোন (TSH) এর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
অটোইমিউন সমস্যার সন্দেহ হলে বিশেষ অ্যান্টিবডি পরীক্ষাও করা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার ও অবস্থা বোঝার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষারও প্রয়োজন হয়।
রোগের কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী থাইরয়েডাইটিসের চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। যদি থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হিসেবে লেভোথাইরক্সিনের মতো ওষুধ ব্যবহার করা হয়। প্রদাহ ও ব্যথা কমানোর জন্য অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধ বা প্রয়োজনে কর্টিকোস্টেরয়েডও দেওয়া হতে পারে।
থাইরয়েডাইটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের ভূমিকা
চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আয়োডিন, সেলেনিয়াম ও জিঙ্কসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য থাইরয়েডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকাও রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
কেন থাইরয়েডাইটিস চিকিৎসা অতিদ্রুত করাতে হবে?
চিকিৎসা না করলে থাইরয়েডাইটিস দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জটিলতার কারণ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হাইপোথাইরয়েডিজম, গলগন্ড এবং বিরল ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ‘থাইরয়েড স্টর্ম’-এর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং নিয়মিত চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই থাইরয়েডের যেকোনো অস্বাভাবিক লক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
