

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


প্রযুক্তির স্পর্শে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয়। কিন্তু যে প্রযুক্তি আমাদের সংযোগ বাড়াতে এসেছিল, তা-ই কি আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে?
বর্তমান যুগে ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ইন্টারনেট আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বাভাবিক আগ্রহ ও দক্ষতাকে গ্রাস করছে।
এটি কেবল তাদের পরীক্ষার ফলাফলই খারাপ করছে না, বরং তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক চরম মানসিক উদ্বেগ ও একাকিত্বের দিকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এই আশঙ্কাজনক বাস্তবতাকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের জীবনে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও কানাডার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কিছু উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
১. পড়াশোনায় অনীহা ও একাডেমিক বিপর্যয়
যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফিল রিড-এর মতে, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বাভাবিক গতি কেড়ে নিচ্ছে।
ইন্টারনেটের নেশা শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে পড়ার আগ্রহ ও দক্ষতা দুটোই কমে যাচ্ছে। ফলে পড়াশোনার প্রতি তাদের মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
আসক্ত শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার কাজগুলো গুছিয়ে করতে পারে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই একাডেমিক পারফরম্যান্স বা পরীক্ষার ফলাফলের দিক থেকে তারা অন্যদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ছে।
২. পরীক্ষাভীতি এবং মানসিক ও সামাজিক একাকিত্ব
সাধারণত পরীক্ষার আগে সামান্য টেনশন হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ইন্টারনেট আসক্তি এটিকে চরম আতঙ্কে রূপ দিচ্ছে।
অহেতুক পরীক্ষাভীতি: পড়া ঠিকমতো শেষ করতে না পারার কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাকে ভীষণ ভয় পেতে শুরু করে এবং এটি নিয়ে সারাক্ষণ তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক মেলবন্ধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইন্টারনেটের কারণে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
একাকিত্ব ও হতাশা: এই সামাজিক দূরত্ব শিক্ষার্থীদের মনের ভেতর একাকিত্বের জন্ম দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে গভীর হতাশায় রূপ নেয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি: কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, যারা দিনে অতিরিক্ত সময় অনলাইনে কাটায়, তাদের মানসিক সমস্যা দিন দিন জটিল আকার ধারণ করে।
গবেষকেরা এটি পরিমাপ করতে 'ইন্টারনেট অ্যাডিকশন টেস্ট' (IAT)-সহ দুটি ভিন্ন স্কেল ব্যবহার করেছেন।
৩. গবেষণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২৮৫ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্যগুলো পেয়েছেন:
ব্যবহারের সময়: গবেষণায় অংশ নেওয়া ২৫% শিক্ষার্থী দৈনিক ৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে কাটাতেন। বাকিরা ১ থেকে ৩ ঘণ্টা ব্যবহার করতেন।
ব্যবহারের ধরন: জরিপকৃতদের ৪০% শিক্ষার্থী প্রধানত বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া সাইট ব্যবহার করতেন এবং ৩০% শিক্ষার্থী তথ্য খোঁজার কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন।
গবেষকদের পরামর্শ
ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক মাইকেল ভ্যান আমেরিনজেন বলেন, গত দুই দশকে ইন্টারনেটে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
মানুষ এখন বিনোদন, তথ্য ও যোগাযোগের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অনলাইনমুখী। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে।
উচ্চশিক্ষার জন্য পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা ও ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা থাকা জরুরি। তাই প্রযুক্তির ক্ষতিকর আসক্তি থেকে বেরিয়ে এসে এর পরিমিত ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সময়ের বড় দাবি।