শুক্রবার
২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
যুদ্ধের প্রভাবে হিলিয়াম সংকট

এমআরআই সেবা বিলম্বিত হবার শঙ্কা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০২:২০ এএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে চিকিৎসা খাতসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এমআরআই স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবায় বিলম্ব হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

বর্তমানে বিশ্বে ব্যবহৃত হিলিয়ামের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং কাতারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া। সাধারণত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের সময় উপজাত হিসেবে হিলিয়াম পাওয়া যায়। ফলে এলএনজি উৎপাদন কমে গেলে হিলিয়ামের সরবরাহও স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাতার প্রায় ৬৩ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উৎপাদন করেছে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তবে এই বিপুল সরবরাহ মূলত সমুদ্রপথে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কাতারের অধিকাংশ হিলিয়াম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ইরানের নতুন বিধিনিষেধ। দেশটি জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।

এর পাশাপাশি কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঘটনাও সংকটকে গভীর করেছে। রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পাঞ্চলে আঘাত হানার ফলে এলএনজি উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে কাতারের এলএনজি রপ্তানির সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হিলিয়াম উৎপাদনে। কাতার জানিয়েছে, তাদের তরল হিলিয়াম রপ্তানি বছরে ১৪ শতাংশ কমবে। আগামী কয়েক বছর এই সংকট অব্যাহত থাকতে পারে।

হিলিয়াম পরিবহনও জটিল। এটি খুবই হালকা গ্যাস, তাই তরল আকারে বিশেষ কন্টেইনারে সংরক্ষণ করা হয়। তবে তরলীকরণের পর ৪৫ দিনের মধ্যে ব্যবহার না করলে তা আবার গ্যাসে পরিণত হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পরিবহন বিলম্বিত হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে।

এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান ও চীন। এসব দেশ কাতারের হিলিয়ামের বড় ক্রেতা। যদিও বেশিরভাগ সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে হয়, তবুও সরবরাহ কমে গেলে বাজারে চাপ বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, ৩০ দিনের বিঘ্ন ঘটলে হিলিয়ামের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর ৬০ থেকে ৯০ দিনের সংকটে দাম ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর উত্তর লুকিয়ে আছে হিলিয়ামের বৈশিষ্ট্যে। এটি অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল থাকে। প্রায় শূন্য কেলভিনের কাছাকাছি তাপমাত্রায়ও এটি স্থিতিশীল। এছাড়া এটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস, অর্থাৎ অন্য কোনো পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।

এই কারণেই এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট ঠান্ডা রাখতে হিলিয়াম অপরিহার্য। এটি ছাড়া শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি সম্ভব নয়, যা শরীরের অভ্যন্তরের স্পষ্ট ছবি তৈরি করতে প্রয়োজন।

বিশ্বে ব্যবহৃত মোট হিলিয়ামের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহ কমে গেলে চিকিৎসা খাতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও হিলিয়াম অপরিহার্য। স্মার্টফোন, গাড়ি, ডেটা সেন্টারসহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে।

হিলিয়ামের বিকল্প এখনও কার্যকরভাবে তৈরি হয়নি। যদিও কিছু গবেষণায় হিলিয়ামবিহীন এমআরআই প্রযুক্তি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়নি।

বিশ্বে এর আগে ২০০৬ সালের পর থেকে একাধিকবার হিলিয়াম সংকট দেখা গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারাবাহিকতার পঞ্চম বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিলিয়াম উৎপাদক। তবে তারাও উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এমআরআইসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবায় বিলম্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন