

মাত্র দুই মাসে ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট করে ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে টিকে গ্রুপ। এরমধ্যে কোম্পানিটির মুনাফা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এনপিবি নিউজের এক অনুসন্ধানে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক কোম্পানির তেল বিক্রিতে কারসাজির এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, তেল বিক্রিতে কারসাজির অভিযোগে সম্প্রতি প্রতিযোগিতা কমিশন কোম্পানিটিকে ৩২ কোটি টাকা জরিমানাও করেছে।
এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সালে সরবরাহ ঘাটতির কথা বলে দেশের ৮টি প্রতিষ্ঠান সরকারকে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য করে। অথচ তখন এ আটটি কোম্পানির গুদামে তেলের কোনো সংকট ছিল না। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ছিল টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
শবনম ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে জড়িত একটি সরবরাহ আদেশ এনপিবি নিউজের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, কোম্পানিটি তার পরিবেশকদের কাছে তেল সরবরাহে প্রায় ২৫ দিন সময় নেয়। যেখানে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে চাহিদাকৃত পণ্য সরবরাহ করার নিয়ম রয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১ এর অনুচ্ছেদ ৯ এর (৩) অনুযায়ী একটি সাপ্লাই অর্ডার এর মেয়াদ থাকে ১৫ দিন। এর বেশি মেয়াদ কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না।
অথচ এই আইনের তোয়াক্কা না করেই শবনম ভেজিটেবল অয়েল ও এর পরিবেশকদের মধ্যে একটি পরোক্ষ চুক্তি হয়। যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ এর ধারা ১৫ এর উপধারা ১ অনুযায়ী অন্যায়। এই পরোক্ষ যোগসাজশে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখা দেয় এবং তেলের চাহিদা বাড়ে। আর আট কোম্পানির এই কারসাজির ফলে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয় সরকার।
এর প্রমাণও মেলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে মাসে ভোজ্যতেলের দাম এক লাফে বাড়ে ৮ টাকা। ১৬০ টাকা প্রতি লিটারে বিক্রি হওয়া তেল ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করলেও এই দামে বিক্রি হয়নি। বরং সেসময় ১৭৫ টাকার নিচে তেল পাওয়া যায়নি।
এনপিবির অনুসন্ধানে দেখা যায়, শবনম ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানি তাদের তৎকালীন উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগায়নি। কৃত্রিম সংকট তৈরি করার লক্ষ্যে তাদের ক্ষমতার অর্ধেকে নামিয়ে আনে তেলের উৎপাদন। এ সময় কোম্পানিটি যা উৎপাদন করতো তার পুরোটাও বাজারে সরবরাহ করেনি। সে সময়ে কোম্পানিটির অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ব্যাপক মজুদ পাওয়া যায়।
২০২২ সালের এপ্রিলে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে তেলের চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে যায়। ঠিক এ সময়টিকেই বেছে নেয় কোম্পানিটি তেলের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের।
সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্য মতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় মে মাসে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে ৩০ শতাংশ। বাজারে তেলের ঘাটতির অজুহাতে ২২ দশমিক ৪৭ ও ২৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ দাম বাড়ে ভোজ্যতেলের। ঠিক এ সময়ে তেল পরিবেশকরা তাদের সাপ্লাই অর্ডার বা পরিবেশন আদেশ হাতবদল করে দাম বাড়ায়। এরমধ্যেই শবনম ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানিটি তাদের কাছে থাকা পণ্যের আদেশ অনুযায়ীও তেল সরবরাহ করেনি।
২০২২ সালের এই সময়টিতে তেলের দাম বাড়িয়ে টিকে গ্রুপের কোম্পানি শবনম অয়েল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে। এছাড়া শুধু ৫০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করে। যার পুরোটাই সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা। সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি দিয়ে সরকারকে জিম্মি করে মানুষের পকেট কেটে মুনাফা করে টিকে গ্রুপ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখানে কোম্পানির কাছে লিখিত জবাব জানতে চায় কমিশন। এছাড়া শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থাপিত যুক্তি তর্ক এবং আইনের বিশ্লেষণ করে কমিশন কোম্পানিটির কারসাজির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়।
অভিযোগ ও জরিমানাসহ তেল সিন্ডিকেটের সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে টিকে গ্রুপের ডিরেক্টর মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এনপিবি নিউজ। তার ব্যক্তিগত নাম্বারে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পাশাপাশি তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ করা হলেও তিনি তার রিপ্লাই দেননি। পরবর্তীতে টিকে গ্রুপের হেড অব ব্রান্ডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে টিকে গ্রুপের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় কোম্পানিটির এমডি মো. আবুল কালামের সঙ্গে। প্রতিযোগিতা কমিশন কর্তৃক তেল সিন্ডিকেটের অভিযোগে জরিমানার প্রসঙ্গটি তুলতেই ‘আমি জানি না’ বলে ফোন কেটে দেন তিনি। এরপরে একাধিকবার ফোন দিয়েও তার বক্তব্য জানা যায়নি। পরবর্তীতে তার ব্যক্তিগত নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
তবে কোম্পানির সূত্রে জানা গেছে, জরিমানার বিষয়টি এমডি আবুল কালামসহ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন সবাই জানেন। এ বিষয়ে তাদের আলোচনাও হয়েছে। তারা হাইকোর্টে প্রতিযোগিতা কমিশনের রায়কে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মুনাফা ৫০০ কোটির বিপরীতে জরিমানা মাত্র ৩২ কোটি
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের আইনে জরিমানা করার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কোম্পানির কারসাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সে কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায়, শবনম ভেজিটেবল অয়েল কোম্পানির ২০২২ সালের বার্ষিক টার্নওভার ছিল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেখানে কমিশন জরিমানা করেছে মাত্র ৩২ কোটি টাকা। যেখানে তেল সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করায় শুধু লাভই হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জরিমানা করার সর্বোচ্চ সীমার মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে কোম্পানিটিকে।
জরিমানা করার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসনের সঙ্গে। তিনি এ বিষয়ে কমিশনের সদস্য আফরোজা বিলকিসের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে কমিশনের আইন শাখার সদস্য আফরোজা বিলকিস এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এই কোম্পানির বিরুদ্ধে কমিশনে এইটাই প্রথম মামলা। তাই আমরা সর্বোচ্চ জরিমানা না করে একটা অংকের জরিমানা করেছি। সবাইকেই তো আসলে রিফর্মের সুযোগ দিতে হয়। আমরাও তাই দিয়েছি। যদি এরপরে আরো কোনো মামলা হয় তবে আরো বেশি জরিমানা করা হবে। এছাড়া কোম্পানিটি একা এই অপরাধ করেনি। আরো চার-পাঁচটি কোম্পানি জড়িত ছিল। সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব তানভীর আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘প্রতিযোগিতা কমিশন যেহেতু মামলায় রায় দিয়েছে এতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে যদি বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয় মনে করেন কোম্পানির কাছ থেকে ব্যাখ্যা নেবেন তবে মন্ত্রণালয় থেকে আমরা চিঠি দেব।’
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক যুগ্মসচিব সেবাস্টিন রেমা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। উল্লেখ্য, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে সরকার এখনো কাউকে নিয়োগ দেয়নি।
এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘জরিমানা যত টাকাই করুক, এক টাকাও শেষমেশ আদায় হয় না। শুরুর দিকে একটু হইচই হয়, পরবর্তী বাণিজ্য সচিবের কাছে গেলেই মাফ হয়ে যায়। এটাই সমস্যা। আপিল অথরিটি সম্পূর্ণ জরিমানা মাফ করে দিতে পারে। আমরা এই আইনের সংশোধন চেয়েছি।’