সোমবার
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১০ লাখ মানুষের ছানি, ‘ক্যাটারেক্ট-ফ্রি বাংলাদেশ’ গড়ার আহ্বান

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৭ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
expand

দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এসব রোগীর চিকিৎসায় পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে ‘ক্যাটারেক্ট-ফ্রি’ করার উদ্যোগ নিতে চক্ষু চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে বাংলাদেশ একাডেমি অব অপথালমোলজির ১৯তম অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং অ্যান্ড সায়েন্টিফিক কনফারেন্স-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছানির কারণে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গ্রাম-গঞ্জে পড়ে আছেন। এই সমস্যার সমাধানে চক্ষু বিশেষজ্ঞদেরই সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও কর্মপরিকল্পনা দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে যদি পরিসংখ্যান থাকে যে ১০ লাখ মানুষ ছানিতে ভুগছেন, তাহলে চিন্তা করুন কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়। এক হাজার সার্জন যদি ছানি অপারেশন শুরু করেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে ক্যাটারেক্ট-ফ্রি বাংলাদেশ করার লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে।’

চক্ষু চিকিৎসায় উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, ছানি এমন একটি সমস্যা, যার চিকিৎসার মাধ্যমে একজন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে ওই ব্যক্তির অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসে। তাই বিপুলসংখ্যক ছানি রোগীর চিকিৎসায় সরকার ও চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

চক্ষু চিকিৎসকদের জন্য রাজধানীর মিরপুরে এক বিঘা জমির মতো মূল্যবান জায়গা ছোটখাটো ক্লিনিক নির্মাণে ব্যবহার না করে দীর্ঘমেয়াদি ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা আগামী ৫০ বছর মানুষের সেবা দিতে পারে। ছোটখাটো কোনো প্রকল্প নিয়ে এলে তিনি সমর্থন করবেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।

দেশের বাইরে চোখের চিকিৎসার জন্য রোগী যাওয়ার প্রবণতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন অধ্যাপক জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, দেশে উন্নত ও বিশেষায়িত চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশমুখী হতে না হয়। এ ক্ষেত্রে দেশের চক্ষু বিশেষজ্ঞদের আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশে কর্নিয়া ডোনেশন ও প্রতিস্থাপন কার্যক্রম জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কর্নিয়ার জন্য দীর্ঘদিন শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের ওপর নির্ভর করে থাকা কাঙ্ক্ষিত নয়। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যাকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে দেশের মানুষের মধ্য থেকেই কর্নিয়া ডোনেশনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কর্নিয়া ডোনেশন নিয়ে জনসচেতনতা ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পুনরায় জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অঙ্গদানের নতুন আইন হয়েছে। এখন কর্নিয়া ও ক্যাডাভেরিক ডোনেশনের ক্ষেত্রে আইনটির কার্যকর বাস্তবায়নে চিকিৎসকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।

দেশের চক্ষু চিকিৎসার বিকাশের ইতিহাস লিখিতভাবে সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসার যে বিবর্তন ঘটেছে, তা নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা ও প্রবন্ধ তৈরি করার আহ্বান জানান। এতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকরা দেশের চক্ষু চিকিৎসার অগ্রযাত্রার ইতিহাস জানতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় ফ্রেশ থেকে শুরু করি। এটা না করে আমাদের অতীতকে জানতে হবে।’

চক্ষু চিকিৎসা খাতকে আরও এগিয়ে নিতে নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের সুযোগ দেওয়ার ওপরও জোর দেন অধ্যাপক জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ৩০ থেকে ৫৫ বছর বয়সী চিকিৎসকরাই এখন মূলত কাজের সময়ের মধ্যে রয়েছেন এবং তারাই আগামী দিনে এই বিশেষায়িত চিকিৎসা খাতকে এগিয়ে নেবেন। তাই তরুণ চিকিৎসকদের কাজের সুযোগ, উৎসাহ এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।

নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চক্ষু চিকিৎসার বিভিন্ন শাখাকে আরও উন্নত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিশেষ করে নিউরো-অপথালমোলজি ও পোস্টেরিয়র সেগমেন্টের চিকিৎসায় আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। কোভিড-পরবর্তী এবং টিকাদানের পর দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়েও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। এসব সমস্যার সঙ্গে কোভিড বা টিকার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণা করে বের করার আহ্বান জানান তিনি।

চিকিৎসকদের অধিকার ও পেশাগত সুরক্ষার পাশাপাশি রোগীসহ সমাজের অন্য পেশাজীবীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু চিকিৎসকদের সুরক্ষা আইন হলেই হবে না; রোগী, শিক্ষক, প্রকৌশলীসহ সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সুরক্ষা হতে হবে সবার জন্য। নিজের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও মর্যাদাকেও সম্মান করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলেন, চিকিৎসকরা সমাজের বাইরে বিচ্ছিন্ন কোনো মানুষ নন। তাদের পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। তাই সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পারস্পরিক সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকসহ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ একাডেমি অব অপথালমোলজির সভাপতি অধ্যাপক আবিদ কামাল, সাধারণ সম্পাদক ডা. জানে আলম, বিসিপিএসের সভাপতি অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর, ওএসবির সভাপতি ডা. তৌহিদুজ্জামান ববি, ডা. জিন্নুরাইন নিউটন, ডা. মেহবুল কাদির, একাডেমির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. শামসুল হকসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পাকিস্তানের পেশোয়ার ও করাচি এবং নেপাল থেকেও অতিথি চক্ষু বিশেষজ্ঞরা সম্মেলনে অংশ নেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank