

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ফিরে এসেই ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছে নরওয়ে। নকআউট পর্বে শক্তিশালী ব্রাজিলকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
একসময় বিশ্বমঞ্চ থেকে হারিয়ে যাওয়া দলটি এবার আর্লিং হালান্ড এবং মার্টিন ওডেগার্ডদের মতো তারকাদের নেতৃত্বে এক নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে
ব্রাজিলের বিপক্ষে এই ঐতিহাসিক জয় শুধু মাঠের সাফল্যই নয়, বরং পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে নরওয়ের দিকে। শুধু ফুটবলই নয় নরওয়ে বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে ব্যাপক পরিচিত।
বিশ্বের সবচেয়ে সুখী, নিরাপদ ও উন্নত দেশগুলোর তালিকায় নরওয়ে সবসময়ই শীর্ষস্থানে থাকে। এর মূল কারণ দেশটির চমৎকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
নাগরিকদের জন্য উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে শিক্ষা, বেকার ভাতা, দীর্ঘমেয়াদি মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং বার্ধক্যকালীন আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার।
ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই নাগরিকেরা এক দুশ্চিন্তাহীন ও শান্তিপূর্ণ জীবন উপভোগ করতে পারেন।
নরওয়ের সুখ ও সমৃদ্ধির অন্যতম বড় ভিত্তি হলো এর শক্তিশালী অর্থনীতি। উত্তর সাগরে বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি আবিষ্কারের পর দেশটি বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
তবে নরওয়ে এই খনিজ সম্পদ থেকে পাওয়া টাকা সরাসরি খরচ না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ 'সার্বভৌম সম্পদ তহবিল' (Sovereign Wealth Fund) গড়ে তুলেছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনার কারণেই তাদের অর্থনীতি সবসময় স্থিতিশীল থাকে।
নরওয়ের চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষের মনকে সতেজ রাখে। বরফঢাকা পাহাড়, গভীর ফিয়র্ড (fjord), মনোরম জলপ্রপাত, নর্দার্ন লাইটস (অরোরো) এবং মধ্যরাতের সূর্যের এই দেশ সত্যিই অনন্য।
নরওয়েজিয়ানরা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসেন; সপ্তাহান্তে পাহাড়ে হাঁটা, স্কিইং কিংবা মাছ ধরা তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তাদের খাদ্যাভ্যাসেও প্রকৃতির প্রভাব স্পষ্ট।
আটলান্টিকের বিখ্যাত সালমন মাছ, কড, ট্রাউট, চিংড়ি, ব্রাউন চিজ এবং ঐতিহ্যবাহী 'লেফসে' রুটি তাদের প্রধান খাবার। শীতপ্রধান দেশ হওয়ায় এখানে ধূমায়িত ও সংরক্ষিত মাছ খাওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের দেশ নরওয়ের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত 'ভাইকিং যুগে' এখানকার সাহসী নাবিক ও যোদ্ধারা সমুদ্রপথে ইউরোপ থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন।
দক্ষ জাহাজ নির্মাতা ও ব্যবসায়ী হিসেবে ইতিহাসে তারা অমর হয়ে আছেন। ১৮১৪ সালে নিজস্ব সংবিধান পেলেও নরওয়ে দীর্ঘদিন সুইডেনের সঙ্গে রাজনৈতিক ইউনিয়নে আবদ্ধ ছিল।
অবশেষে ১৯০৫ সালে একটি গণভোটের মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে আধুনিক নরওয়ে।
নরওয়েজিয়ান সমাজের মূল ভিত্তি হলো সমতা ও ন্যায়বিচার। নারী-পুরুষের সমান অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীন পরিবেশ এবং পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি এ দেশকে মানবিক করে তুলেছে।
এখানে দুর্নীতির হার নেই বললেই চলে, আইনের শাসন অত্যন্ত কড়া এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা প্রবল। একই সাথে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ আধুনিক ও সরকারি স্তরে নিখরচায় উচ্চমানের শিক্ষা দেওয়া হয়।
ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় দারুণ উৎসাহ দেওয়া হয়, যার সুফল আজ তারা ফুটবলেও পাচ্ছে।
ভাইকিংদের সাহসী উত্তরসূরিরা আজ শুধু সমুদ্র জয়ের গল্প নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক সমতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং ফুটবলের দারুণ উত্থানের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য রোল মডেল হয়ে উঠেছে।
