

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আধুনিক প্রসাধনী শিল্পে, বিশেষ করে ঠোঁটের সাজগোজের প্রসাধন যেমন লিপস্টিকে, পণ্যের স্থায়িত্ব ও মসৃণতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের পলিমার ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ঠোঁটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি মানবস্বাস্থ্য এবং জলজ পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।
অসচেতনভাবে পেটে চলে যাওয়া প্লাস্টিক কণা এবং ব্যবহার শেষে ধুয়ে যাওয়া ক্ষতিকর রাসায়নিকের নেতিবাচক প্রভাব রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিকল্প উপকরণের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।
লিপস্টিকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার ও উৎস
লিপস্টিককে দীর্ঘস্থায়ী (Long-lasting), মসৃণ (Smooth) এবং আকর্ষণীয় টেক্সচার দিতে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত সিন্থেটিক পলিমার বা মাইক্রোপ্লাস্টিক যোগ করে থাকে।
ঠোঁটে প্রয়োগের পর লিপস্টিক যেন সহজে মেখে না যায় এবং দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকে, সে জন্য পলিথিন (Polyethylene) বা অন্যান্য মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো হয়।
তাছাড়া ম্যাট (Matte) বা গ্লসি (Glossy) ফিনিশ প্রদান করতে ব্যবহার করা হয় সিন্থেটিক মোম ও প্লাস্টিক কণা।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ম্যাট বা লং-লাস্টিং লিপস্টিকই নয়, অনেক প্রখ্যাত ব্র্যান্ডের ময়েশ্চারাইজিং লিপস্টিকেও আর্দ্রতা ধরে রাখার বাহক হিসেবে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা উপস্থিত থাকে।
উপাদান তালিকা ও প্লাস্টিক কণা শনাক্তকরণ
সাধারণ ভোক্তারা লিপস্টিকের প্যাকেটে ব্যবহৃত উপাদানের তালিকা (Ingredient List) খেয়াল করলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারেন।
প্যাকেটে যদি পলিথিন (Polyethylene), অ্যাক্রিলেটস (Acrylates Copolymer / Acrylates Crosspolymer), নাইলন-১২ (Nylon-12) কিংবা পলিপ্রোপিলিন (Polypropylene)-এর মতো নাম লেখা থাকে, তবে বুঝতে হবে পণ্যটিতে কৃত্রিম প্লাস্টিক বা পলিমার কণা ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব উপাদান মূলত লিপস্টিকের গাঠনিক রূপ উন্নত করতে এবং মসৃণতা আনতে কৃত্রিমভাবে সংযোজন করা হয়।
মানবস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব
লিপস্টিকে ব্যবহৃত এই প্লাস্টিক কণা মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঠোঁটে ব্যবহৃত লিপস্টিক খাবার, পানি খাওয়া কিংবা কথা বলার সময় সামান্য পরিমাণে হলেও অজান্তে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে।
গবেষণানুসারে, একজন নিয়মিত লিপস্টিক ব্যবহারকারী বছরে গড়ে বেশ কয়েক গ্রাম লিপস্টিক গিলে ফেলেন।
দীর্ঘদিন ধরে শরীরে প্লাস্টিক কণা এবং এর সাথে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিক প্রবেশের ফলে হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা, হজমপ্রক্রিয়ায় গোলযোগ সহ নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরিবেশ ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের ঝুঁকি
মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি এটি পরিবেশ ও জলজ জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। প্রসাধন সামগ্রীতে ব্যবহৃত এই অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা মেকআপ তোলার পর বা মুখ ধোয়ার সময় ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি নদী ও সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
ফিল্টার সিস্টেমে আটকা না পড়ে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি জলজ বাস্তুতন্ত্রে মিশে যায়, যা পরবর্তীতে সামুদ্রিক প্রাণীরা খাদ্য মনে করে গ্রহণ করে।
পরিশেষে, সেই সামুদ্রিক মাছ বা খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে প্লাস্টিক আবার মানবদেহের খাদ্যশৃঙ্খলেই ফিরে আসে।
প্রতিকারের উপায়
সুন্দর ঠোঁটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা বজায় রাখতে নিরাপদ প্রসাধনী নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। লিপস্টিক কেনার আগে প্যাকেটের উপাদান তালিকা ভালোভাবে যাচাই করে Polyethylene বা Acrylates মুক্ত পণ্য নির্বাচন করা উচিত।
প্লাস্টিকের পরিবর্তে অর্গানিক মোম (যেমন Beeswax, Candelilla Wax) এবং প্রাকৃতিক তেল সমৃদ্ধ লিপস্টিক ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে প্রসাধনী সামগ্রীতে ক্ষতিকর পলিমার ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।