

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


জনসংখ্যা ও বর্তমান অবস্থান
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত প্রায় ৫ লাখ ৫ হাজার মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। ২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, এ দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ (প্রায় ৪,৯০০ জন) মুসলিম।
সুন্নি মতাদর্শের এই মুসলিমদের সিংহভাগই সেনেগাল, গিনি-বিসাউ ও মালির মতো পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসী। তারা মূলত রাজধানী প্রাইয়া, সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিনদেলো, বোয়া ভিস্তা ও সাল দ্বীপের মতো শহুরে এবং পর্যটন এলাকাগুলোতে বসবাস করেন।
স্থানীয় খুচরা ব্যবসা, হস্তশিল্প, সেবা ও নির্মাণ খাতে যুক্ত থেকে তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ইসলাম আগমনের ইতিহাস ও ঔপনিবেশিক দমন-পীড়ন
১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা যখন কেপ ভার্দেতে উপনিবেশ ও দাস-বাণিজ্যের ঘাঁটি গড়ে তোলে, তখনই মূলত পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের মাধ্যমে এখানে ইসলামের আগমন ঘটে।
ওলোফ, মানদিলকা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর এই মুসলিমদের অনেকেরই ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি বেশ মজবুত ছিল। তবে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসকেরা এখানে ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে।
ফলে মুসলিমদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হতো এবং কোরআন তিলাওয়াত, মসজিদ নির্মাণ বা প্রকাশ্য ইবাদতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
দীর্ঘ দমন-পীড়নে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি কাঠামো টিকে থাকতে না পারলেও, কেপ ভার্দিয়ান ‘ক্রেওল’ ভাষায় কিছু ওলোফ ও মানদিলকা শব্দের মাধ্যমে ইসলামের এই ঐতিহাসিক ছাপ আজও রয়ে গেছে।
স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত
১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দের নতুন সংবিধানে সব ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। ফলে দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক বাধা পেরিয়ে মুসলিমরা স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার সুযোগ পান।
এরপর ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও পর্যটনের বিকাশে পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট (ECOWAS) থেকে প্রচুর মুসলিম অভিবাসী আসতে শুরু করেন।
৯৯০ সালে রাজধানী প্রাইয়ায় দেশটির প্রথম সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মসজিদ নির্মিত হয়। পরবর্তীতে, ২০১৪ সালের একটি আইনের মাধ্যমে অন্তত ৫০০ সদস্যের ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে বিচার মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি স্বীকৃতি ও করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়, যা মুসলিম সংগঠনগুলোর অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করে।
ধর্মীয় অবকাঠামো ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব
কেপ ভার্দেতে মুসলিমদের ধর্মীয় অবকাঠামো এখনো কিছুটা সীমিত। সাল দ্বীপে বর্তমানে তিনটি ছোট ইবাদতখানা রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে জমি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজধানী প্রাইয়ায় ইমাম আহমাদু নেকাথিয়ানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মসজিদ ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় তা এখনো শেষ হয়নি।
বর্তমানে ‘কম্যুনিদাদে ইসলামিকাদে কাবো ভের্দে’ এবং ২০২২ সালে গঠিত ‘অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা দে দাওয়াহ দে কাবো ভের্দে’ নামের সংগঠনগুলো মুসলিমদের কল্যাণে কাজ করছে।
ইমাম ইবরাইমা সিদি এবং মুয়াজ্জিন সেকু সুয়ারেজের মতো ব্যক্তিত্বরা এখানে ইসলামি দাওয়াহ, জাকাত বিতরণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক সম্প্রীতি
কেপ ভার্দের মুসলিমরা স্থানীয় ক্যাথলিক প্রধান সমাজের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রেখেছেন। রমজান মাসে পারস্পরিক সম্প্রীতির মাধ্যমে রোজা পালন শেষে ঈদের দিনে তারা রাজধানী প্রাইয়ার ‘তিরা শাপিউ’ মাল্টিপারপাস হলে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
স্থানীয়ভাবে ‘তাবাস্কি’ নামে পরিচিত ঈদুল আজহা এখানে তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়, যেখানে কোরবানির পশুর মাংস দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষেও এখানে সীমিত পরিসরে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল হয়।
১৯৯২ সালের ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনের কারণে মুসলিমরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হন না এবং ২০২২ সালে এখানে ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক ইকোওয়াস (ECOWAS) সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সামগ্রিক অবদান
ধর্মীয় সম্প্রীতি থাকলেও কেপ ভার্দের মুসলিমদের কিছু বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। ২০১৪ সালের কঠোর রেসিডেন্স পারমিট (REJ) নীতির কারণে অনেক সেনেগালিজ মুসলিম কর্মসংস্থান ও বৈধ কাগজপত্রের জটিলতায় পড়েছেন।
পাশাপাশি দ্বীপদেশটিতে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং পর্যটন খাতের ওঠানামাও তাদের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে আশার কথা হলো, এখানে কোনো উগ্রবাদ বা ধর্মীয় চরমপন্থার রেকর্ড নেই।
বর্তমানে মুসলিম সম্প্রদায়ের সভাপতি জেরাল্ডো গাউডেন্সিও গোমেজ দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করে জাতীয় ঐক্য ও শান্তির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছেন।
এছাড়া ‘আল ওয়াসিলাহ ফাউন্ডেশন’ এর মতো স্থানীয় সংগঠনগুলো দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে এবং মুসলিম অভিবাসীদের হাত ধরে সেনেগালিজ ঐতিহ্যবাহী খাবারও কেপ ভার্দের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
