মঙ্গলবার
০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাবি ছাত্রদলের ৮ কর্মীর বিরুদ্ধে মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৬ এএম আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে তিনজনকে মারধর, মোটরসাইকেল আটকে রেখে ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় শুক্রবার (১৭ জুলাই) শাহবাগ থানায় আটজনের নামে এবং অজ্ঞাতপরিচয়ের অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম সাজিদ।

সাজিদের দাবি, নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে দুই দফায় শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে একজনকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে গিয়ে মারধরের চেষ্টা করা হলে তিনি শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন।

গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১টার পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর, মল চত্বর ও শাহবাগ এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গত ১৪ মে একই ভুক্তভোগীদের থেকে ৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগের বেশিরভাগই অস্বীকার করেছেন।

ভুক্তভোগীরা হলেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ফারদিন খান, আব্দুর রহিম সাজিদ ও মোর্শেদ আহমেদ। তিনজনই ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে সাজিদ একই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। ফারদিন বর্তমানে অন্য একটি কলেজ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। অন্যদিকে মোর্শেদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত।

জানা গেছে, সাজিদের জিহ্বা, চোখ, ঘাড় ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ফারদিনের চোখ, নাক, কান, ঠোঁটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। মোর্শেদের হাত ও পিঠেও আঘাত রয়েছে। ঘটনার পর তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানান।

অভিযোগপত্রে অভিযুক্তরা হলেন, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হলের ইংলিশ ফর স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজ (ESOL) বিভাগের আল শামস, জিয়াউর রহমান হলের পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সাদমান সাকিব, সূর্যসেন হলের মাশরুর কামাল মাহি ও শিব্বির আহমেদ। এছাড়া ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অভি রহমান, একই হলের সাইফুর রসুল পলাশ ও ফারসি ভাষা বিভাগের তামজিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের হীরা রহমানের নামও অভিযোগে রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, গত ১৪ মে সংঘটিত মারধর ও ছিনতাইয়ের ঘটনাতেও আশ শামস, মাশরুর কামাল মাহি, শিব্বির আহমেদসহ একই দলের আরও কয়েকজন জড়িত ছিলেন।

এদিকে অভিযোগপত্রে নাম না থাকলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, ছবি দেখে তারা ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিহাব, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সানিয়াত শুভ এবং অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অমিত হাসান অমিকে হামলায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তদের মধ্যে আল শামস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অভি রহমান ও হীরা রহমান ছাত্রদল নেতা আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের রাজনীতির করেন। সাদমান সাকিব সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্তের সাথে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।

এছাড়া তামজিদ ও শিব্বির আহমেদ ছাত্রদল নেতা তানভীর আল হাদী মায়েদের, সাইফুর রসুল পলাশ ও মাশরুর কামাল মাহিন তানভীর বারী হামিমের এবং অমিত হাসান অমি ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। অভিযুক্তদের বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে।

শাহবাগ থানার ডিউটি অফিসার তৌকির আহাম্মেদ বলেন, হঠাৎ করে একটি ছেলে দৌড়ে থানায় আসে। তার সাথে আরও কয়েকজন ছিলেন। তবে উভয় পক্ষই থানায় নিজেদের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা করে চলে যায়। পুরো ঘটনার বিস্তারিত তখন আমাদের জানা ছিল না। এছাড়া ডাকসুর সিসিটিভি ক্যামেরায় রহিমকে নিয়ে যাওয়ার সত্যতা মিলেছে।

এদিকে আহত শিক্ষার্থী মোর্শেদ বলেন, রহিমকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি ভিসি চত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রশক্তির নেতা হাসিব আল ইসলামের সাথে দেখা হয়। পূর্ব পরিচিত হওয়ায় তখন তিনি হাসিবকে জানান, তার বন্ধুকে মারধরের উদ্দেশ্যে উদ্যানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানার পর হাসিব তাকে মোটরসাইকেলে নিয়ে রহিমকে খুঁজতে বের হন। পরে তিনি ছাত্রদলের এক নেতার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। ওই নেতা আল শামসকে ফোন করে কথা বললেও, একবার কথা বলার পর শামস ফোন বন্ধ করে দেন বলে দাবি করেন মোর্শেদ।

ফারদিন বলেন, হাসিব আল ইসলামের উদ্যোগে সমাধানের চেষ্টা করা হলে আমি আবার নীলক্ষেত থেকে ভিসি চত্বরে আসি। সেখানে শামস ও তার সহযোগীরা এসে হাসিব এবং ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার সামনেই তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে আমাকে রহিমকে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে আনতে বলা হয় এবং তা না করলে মারার হুমকি দেওয়া হয়। পরে আমি রহিমকে কল করে আসতে বলি। বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে মনে করে রহিম সেখানে আসেন।

ফারদিন বলেন, আমার কান ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল। তখন হাসিব ভাই আমাকে একটি রিকশায় করে হাসপাতালে যেতে বলেন। এরপর আমি চলে আসি।

অন্যদিকে আব্দুর রহিম সাজিদ জানান, ফারদিনের ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে ফিরে আসেন। সেখানে উপস্থিত সবাই তাকে ঘটনার বর্ণনা দিতে বললেও কথা বলা শুরু করতেই ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী অতর্কিতভাবে তাকে লাথি ও ঘুষি মারতে শুরু করেন। পরে অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও মারধর করে।

রহিম বলেন, আমি দৌড়ে বাঁচার চেষ্টা করলে তারা আমাকে ধাওয়া করে মারধর করে। একপর্যায়ে আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়ি। পরে এক ভাই আমাকে রিকশায় তুলে চলে যেতে বলেন। সেখান থেকে আমি চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই।

ঘটনায় মূল অভিযুক্ত আল শামস অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই সঠিক নয়। ছিনতাই, টাকা নেওয়া বা জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। রহিম আগে আমাদের কয়েকজনের গায়ে হাত তুলেছিল। পরে বিষয়টি মীমাংসাও হয়েছিল। কিন্তু মীমাংসার পরও তার পক্ষ হয়ে ছাত্রশক্তির লোকজন এসে আমাদের হুমকি দেয় এবং ভিসির কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। এরপর বিষয়টি আমরা আমাদের সিনিয়রদের জানিয়েছি।

রহিমকে উদ্যান এলাকায় নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে শামস বলেন, আমরা শুধু কথা বলছিলাম। তাকে মারধর বা অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার অনেকটাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো ধরনের অপহরণ বা জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। পরে সে নিজেই শাহবাগ থানায় যায়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই নিশ্চিত করা হয়েছে যে তার টাকা, মোবাইল বা অন্য কোনো জিনিসপত্র নেওয়া হয়নি এবং তার কোনো ক্ষতিও করা হয়নি।

ফারদিনের মোটরসাইকেল হলে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বাইকটি কেন নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে আমি জানি না।

অভিযুক্ত সানিয়াত শুভ মোটরসাইকেল চালিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি মোবাইলে কথা বলতে ইচ্ছুক না। আপনি এসে সরাসরি কথা বলুন। কোনো ভিডিও থাকলে সেটার বিষয়ে আমি জানি না। আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না।

হীরা রহমান দাবি করেন, মারামারির সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেন, আমি সিনিয়রদের ডাক পেয়ে পরে যাই। তখন মারামারি শুরু হয়ে গেছে। আমি কাউকে মারধর করিনি।

অভি রহমানও মারধরের সময় উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি রাতে জিমে ছিলেন। পরে হলে ফিরে চিৎকার শুনে বাইরে গিয়ে দেখেন ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের সিনিয়ররা বিষয়টি মীমাংসা করছেন। একইভাবে সাদমান সাকিবও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

ঘটনার পরদিন শুক্রবার (১৭ জুলাই)শাহবাগ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী আব্দুর রহিম সাজিদ। অভিযোগ পত্রে তিনি দাবি করেন, ১৬ জুলাই রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে অবস্থানকালে আল শামসের নেতৃত্বে অভিযুক্তরা তার বন্ধু ফারদিনকে মারধর করেন। পরে ফারদিনের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলে তাকে জোর করে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয় এবং অপহরণেরও চেষ্টা করা হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার ডান চোখে আঘাত করা হয়।

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা তার কাছে টাকা দাবি করে এবং টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। পরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে শাহবাগ থানায় আশ্রয় নেন।

লিখিত অভিযোগের বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আমরা একটি অভিযোগপত্র পেয়েছ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এবিষয়ে ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গনেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং প্রথমবারের মতো শুনেছেন। ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তিনি তথ্য প্রমাণ দেখে বিষয়টি যাচাই করবেন বলে জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল রতন বলেন, আমাদের কোনো শিক্ষার্থী মোরাল পুলিশিং, ছিনতাই বা এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে না। যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যদি বাইরের কেউ জড়িত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন