


যুক্তরাষ্ট্রে গরুর মাংসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সুপারমার্কেটে এক বছর আগের তুলনায় গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ, যা সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হারের তিন গুণেরও বেশি। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা খামারি, পশু মোটাতাজাকরণ প্রতিষ্ঠান, মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী কিংবা রেস্তোরাঁ; কেউই তেমনভাবে পাচ্ছে না।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের ফলো দ্য মানি সিরিজে যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংসের পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল এক সপ্তাহ ধরে পর্যবেক্ষণ করে খুঁজে দেখা হয়েছে, কেন দাম এত বেড়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থ কোথায় যাচ্ছে।
খামারিরা রেকর্ড দাম পেলেও বাড়েনি মুনাফা
দক্ষিণ ডাকোটার খামারি এরিক গ্রপারের প্রায় ৮ হাজার একর তৃণভূমিতে ৩৫০টির মতো প্রজননক্ষম গাভী রয়েছে। তার খামারের বেশিরভাগ জমিই পাইন রিজ ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন থেকে ইজারা নেয়া। গ্রপার বছরে একবার তার বাছুরগুলো পশুর নিলামে তোলেন। সেখানে ক্রেতাদের দরেই চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ হয়।
বর্তমানে ৬০০ পাউন্ড (২৭২ কেজি) ওজনের একটি বাছুরের দাম উঠছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডলার। দুই বছর আগে একই বাছুরের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ডলার। এই রেকর্ড দামের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রে গবাদি পশুর তীব্র সংকট। খরা ও রোগের কারণে চলতি বছরের শুরুতে দেশটিতে ১৯৫১ সালের পর সর্বনিম্ন সংখ্যক গবাদি পশু ছিল।
তবে বেশি দাম পেলেও খামারিদের লাভ বাড়েনি। খরার কারণে গ্রপারের ১৩টি প্রাকৃতিক কূপ শুকিয়ে গেছে। ফলে তাকে এখন ট্যাঙ্কারে করে পানি আনতে হচ্ছে। এদিকে উৎপাদন ব্যয়ও ব্যাপক বেড়েছে। আগে যে পিকআপ ট্রাকের দাম ছিল ৪০ হাজার ডলার, এখন সেটির দাম প্রায় ১ লাখ ডলার। কাঠের বেড়ার খুঁটির দাম ৬ ডলার থেকে বেড়ে ১৯ ডলার হয়েছে। এক-চতুর্থাংশ মাইল কাঁটাতারের রোলের দাম ৬০ ডলার থেকে বেড়ে ১৩০ ডলারে পৌঁছেছে। খরার কারণে ঘাসের সংকটও বেড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশের বেশি গবাদি পশু খরা-কবলিত এলাকায় রয়েছে। ফলে খামারিদের অতিরিক্ত খরচ করে খড়, সাইলেজ ও অন্যান্য পশুখাদ্য কিনতে হচ্ছে। গ্রপারের মতে, ‘আমি বিল পরিশোধ করতে পারছি। কিন্তু উৎপাদন খরচ এতটাই বেড়েছে যে এই রেকর্ড দাম না থাকলে আমরা অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যেতাম।’ পশু খামারেও বাড়েনি লাভ
খামার থেকে সরাসরি জবাইখানায় যায় না বাছুরগুলো। প্রায় ছয় মাস বয়সে সেগুলো কিনে নেয় ফিডলট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখানে ভুট্টা ও অন্যান্য শস্য খাইয়ে আরও তিন থেকে ছয় মাস মোটাতাজা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯৫ শতাংশ গবাদি পশুই এভাবে মোটাতাজা করা হয়। বড় ফিডলটগুলোতে একসঙ্গে এক লাখের বেশি পশু রাখা সম্ভব। উইসকনসিন-রিভার ফলস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক ব্রেন্ডা বোয়েটেল বলেন, ফিডলট কোম্পানিগুলো বর্তমানে রেকর্ড দামে গরু বিক্রি করলেও শুরুতেই তাদের সর্বোচ্চ দামে পশু কিনতে হচ্ছে। ফলে তাদেরও অতিরিক্ত মুনাফা হচ্ছে না। প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানেও লোকসান মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পশু জবাই করে বিভিন্ন অংশ আলাদা করে সুপারমার্কেট ও রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চারটি প্রতিষ্ঠান-টাইসন, জেবিএস, কারগিল ও ন্যাশনাল বিফ। বাজারে আধিপত্য থাকার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। এমন অভিযোগ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তবে বাস্তবে উচ্চ দামের এই বাজারেও প্রতিষ্ঠানগুলো বড় মুনাফা করছে না। বরং সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান টাইসন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে শুধু গরুর মাংস ব্যবসায় তাদের ৫০ কোটি ডলারের বেশি লোকসান হয়েছে। এর কারণ, তারা রেকর্ড দামে মাংস বিক্রি করলেও জীবন্ত গবাদি পশুও কিনতে হচ্ছে সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে। নর্থ ক্যারোলিনার হার্পলিস মিটপ্যাকিংয়ের মালিক জেমি ক্রামলি বলেন, গত তিন বছরে জীবন্ত পশুর দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। তবে তারা ইচ্ছামতো মাংসের দাম বাড়াতে পারেন না। কারণ দাম বেশি হলে সুপারমার্কেট, রেস্তোরাঁ ও ভোক্তারা সহজেই মুরগির মাংস বা আমদানিকৃত তুলনামূলক সস্তা গরুর মাংসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আরেকটি সমস্যা হলো, পর্যাপ্ত পশু না পাওয়ায় কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। হার্পলিস কারখানার দৈনিক সক্ষমতা ৪২৫ থেকে ৪৫০টি গরু প্রক্রিয়াজাত করা হলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ৩৫০টি গরু জবাই করা হচ্ছে। ফলে একই ভবন, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিকের খরচ কম সংখ্যক পশুর ওপর ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ক্রামলির হিসাবে, কোনো কোনো দিন প্রতিটি গবাদি পশু থেকেই ১০০ থেকে ৪০০ ডলার পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। রেস্তোরাঁর মুনাফাও সীমিত নেব্রাসকার ওমাহায় অবস্থিত ‘ব্লক ১৬’ রেস্তোরাঁর মালিক পল ও জেসিকা আরবান প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার ৮০০টি বার্গার বিক্রি করেন। এজন্য প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০০ পাউন্ড কিমা করা গরুর মাংস ব্যবহার হয়। ২০১০ সালে রেস্তোরাঁটি চালুর সময় একটি বার্গারের দাম ছিল ৮ দশমিক ৯৫ ডলার। বর্তমানে সেটির দাম ১১ দশমিক ৯৫ ডলার। তবে মাংসের দাম এত বেড়ে যাওয়ায় তাদের মুনাফা খুবই সীমিত। পল বলেন, ‘প্রকৃত মুনাফা করতে চাইলে একটি বার্গারের দাম অন্তত ১৩ ডলার রাখা উচিত। কিন্তু গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে তারা সেই দাম নিচ্ছেন না। আমরা যতটা লাভ করতে চাই, ততটা করতে পারি না। কিন্তু মানুষ এখনও আসছে, আর সবকিছুই শুধু টাকার জন্য নয়।’ তাহলে অতিরিক্ত অর্থ যাচ্ছে কোথায়? পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে দেখা যাচ্ছে, সবাই আগের চেয়ে বেশি দামে কেনাবেচা করছে। খামারি রেকর্ড দামে বাছুর বিক্রি করছেন, কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ও সমানভাবে বেড়েছে। ফিডলটগুলোও বেশি দামে পশু কিনছে। মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চমূল্যে গবাদি পশু কিনে লোকসান গুনছে। আর রেস্তোরাঁ ও সুপারমার্কেটও নির্দিষ্ট সীমার বেশি দাম বাড়াতে পারছে না। অর্থাৎ বাজারে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ লেনদেন হলেও অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ কেউ নিজের কাছে রাখতে পারছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্রে গবাদি পশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে এরিক গ্রপারের মতে, সেটি দ্রুত সম্ভব নয়। একটি বকনা গাভীকে বাছুর জন্ম দিতে সক্ষম হতে প্রায় দুই বছর লাগে। এরপর সেই বাছুরকে জবাইযোগ্য ওজনে পৌঁছাতে আরও এক বছর সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ বাজারে অতিরিক্ত গরুর মাংস আসতে অন্তত তিন বছর সময় লাগবে।