বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ১,২৭৬ কোটির প্রকল্প নিচ্ছে সরকার

মো. তন্ময় ইসলাম
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ পিএম আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

ব্যাংকিং খাতের তদারকি ও ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ (এফএসএসপি-২) নামের পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রায় পুরো অর্থই ব্যয় হবে প্রশিক্ষণ, পরামর্শক নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, কম্পিউটার সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ তৈরির মতো খাতে। প্রকল্পের ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শক, আইসিটি সরঞ্জাম, কম্পিউটার সফটওয়্যার ও ডেটাবেজসহ ছয়টি খাতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ।

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ১ হাজার ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বৈদেশিক অর্থায়ন হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। বাকি ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকল্পে সরকারের সরাসরি অর্থায়ন বা জিওবি বরাদ্দ রাখা হয়নি।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭১১ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট প্রকল্প ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যয় হবে শুধু আইসিটি সরঞ্জাম কেনায়। এর বাইরে কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৩৫৫ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ডেটাবেজ তৈরিতে ৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনায় আরও ১ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনায়ও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের মূলধন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক নিয়োগেও বড় অঙ্কের অর্থ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৫৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭০ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ থেকে ৬৭ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৩ কোটি টাকা দেওয়ার কথা রয়েছে।

পরামর্শক নিয়োগে ব্যক্তি পরামর্শকের জন্য ২৯ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ৬৫ কোটি ৩৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দুই ধরনের পরামর্শক নিয়োগে মোট ব্যয় হবে ৯৪ কোটি ৪৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা। ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২৫৩ জনমাস এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরামর্শকের জন্য ছয়টি চুক্তির সংস্থান রাখা হয়েছে।

প্রকল্পের রাজস্ব খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৮ কোটি ২৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শকের পাশাপাশি সেমিনার ও সম্মেলনে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। যানবাহন ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ইন্টারনেট, ফ্যাক্স ও টেলেক্স, কম্পিউটার সামগ্রী, মুদ্রণ, স্টেশনারি, মেরামতসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে প্রকল্পে নতুন গাড়ি কেনার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। জরুরি প্রয়োজন ও প্রকল্প তদারকির জন্য চুক্তিভিত্তিক গাড়ি ভাড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পরিবহনসেবা নিতে হলে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের বিষয়টিও প্রকল্প পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে প্রকল্প নথিতে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের আর্থিক খাতে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং পুরোনো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষ করে কিছু ব্যাংক, যার মধ্যে সরকারি ও ইসলামী ব্যাংকও রয়েছে, তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো ও সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে সাইবার হামলা এবং সীমান্তপারের আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব সমস্যা আমানতকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব সমস্যা মোকাবিলায় প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, আইসিটি অবকাঠামো উন্নত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারে সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।

প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হয় ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর। ওই সভার পর প্রকল্পের টিএপিপি পুনর্গঠন করা হয়। পর্যালোচনায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা, বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন, প্রকল্পের মেয়াদ এবং কাজের পরিধি স্পষ্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে।

আগের এফএসএসপি প্রকল্প থেকে কিছু যন্ত্রপাতি ও উপকরণ নতুন প্রকল্পে স্থানান্তরের বিষয়টিও পর্যালোচনায় এসেছে। তবে যেসব যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে ব্যবহারের অনুপযোগী বা অচল হয়ে গেছে, সেগুলো নতুন প্রকল্পে স্থানান্তর করা যাবে না। এ জন্য আগের প্রকল্প থেকে কোন কোন যন্ত্রপাতি বা সামগ্রী নেওয়া হবে, তার তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটির জন্য সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, ক্রয় পরিকল্পনা, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প শেষে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রাখার নির্দেশ দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের কথাও বলা হয়েছে। জানা গেছে, প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই শেষে একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে কমিশন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্বল ব্যাংক সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ আইসিটি সরঞ্জাম, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় হওয়ায় এসব খাতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা যাচাই, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সঠিক মূল্য নিশ্চিত করাই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank