শনিবার
১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৩৩ ব্যাংকের ৫৩ কোটি টাকার দাবিদার নেই

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
গ্রাফিক্স : এনপিবি নিউজ
expand
গ্রাফিক্স : এনপিবি নিউজ
  • ১০ বছর লেনদেন নেই, ব্যাংকে পড়ে আছে দাবিহীন টাকা
  • সব ব্যাংকের থাকা আমানত হিসাব করলে শতকোটি ছাড়াবে
  • গ্রাহকের মৃত্যু-বিদেশে স্থায়ী হওয়ায় বাড়ছে অদাবিকৃত আমানত
  • সিটি ব্যাংক এনএ-তে সর্বোচ্চ দাবিহীন আমানত, তালিকায় ব্র্যাক ও এইচএসবিসিও

ব্যাংকে টাকা পড়ে আছে কিন্তু নেই দাবিদার। দাবিহীন এমন অর্ধশত কোটি টাকা দেশের ৩৩টি ব্যাংকে আমানত হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে বছরের পর বছর পড়ে থাকা এসব টাকার খোঁজ নেন না এর মালিকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ৩৩টি ব্যাংকে স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা মিলিয়ে দাবিহীন আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ কোটি টাকা।

দেশের বাকি ২৮টি ব্যাংকের তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব ব্যাংকে থাকা আমানত হিসাব করলে শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা। এনপিবি নিউজকে তিনি বলেন, বেশকিছু কারণে এসব টাকা অ্যাকাউন্টে থেকে যায়। এরমধ্যে রয়েছে গ্রাহকের মৃত্যু, বিদেশে স্থায়ী হওয়া, ঠিকানা পরিবর্তন, মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকা কিংবা উত্তরাধিকারীদের তথ্য না থাকা। এসব অ্যাকাউন্ট বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় থাকে। অনেক সময় পরিবারও জানে না যে, তাদের স্বজনের নামে ব্যাংকে আমানত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের কোনো অ্যাকাউন্টে জমা থাকা আমানতের বিষয়ে ১০ বছর ধরে কোনো দাবিদার পাওয়া না গেলে ওই হিসাবকে অদাবিকৃত আমানত হিসাব (আনক্লেইমড ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট) বলে গণ্য করা হয়। এসব হিসাবের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করার নির্দেশনা রয়েছে। এসব আমানত সংশ্লিষ্ট গ্রাহক বা তার উত্তরাধিকারীদের ফিরিয়ে দিতে প্রায় এক বছর হিসাবধারীর নাম, হিসাব নম্বর ও টাকার পরিমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এ সময় কোনো দাবিদার উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারলে তার অর্থ ফেরত দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সরিয়ে ফেলার পর আরও এক বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই অর্থ ফেরত দিতে রাজি থাকে। প্রতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অদাবিকৃত আমানত জমা নেয়। সব মিলিয়ে অন্তত ১২ বছর তিন মাস সময় দেওয়া হয় অদাবিকৃত আমানত গ্রাহককে ফেরত নেওয়ার জন্য। এরপরও যেসব আমানতের দাবিদার পাওয়া না যায়, সেসব আমানতের অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব ছাড়া কোনো গ্রাহক টানা ১০ বছর লেনদেন না করলে সেই হিসাব দাবিহীন হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এসব অদাবিকৃত আমানত, বৈদেশিক মুদ্রা, চেক, ড্রাফট ও মূল্যবান সামগ্রী নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের মৃত্যু, ঠিকানা পরিবর্তন বা যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় ব্যাংকের পক্ষে হিসাবধারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ হস্তান্তরের আগে আমরা গ্রাহকের ঠিকানায় চিঠি পাঠাই, এসএমএস ও ই-মেইলের মাধ্যমেও যোগাযোগের চেষ্টা করি। এরপরও কোনো সাড়া না পেলে নিয়ম অনুযায়ী অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কোনো গ্রাহক বা উত্তরাধিকারী দাবি করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহকরা যাতে সহজে তথ্য জানতে পারেন, সে জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও ব্যাংকের ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।’

এছাড়া প্রতি বছর এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অদাবিকৃত আমানত জমা নেয়। এবার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ৩৩টি ব্যাংক তাদের অদাবিকৃত আমানতের অর্থ জমা করেছে। অন্যগুলোর মধ্যে ১০টি ব্যাংক অদাবিকৃত অর্থ জমার জন্য সময় বৃদ্ধির আবেদন করেছে। বাকি ১৮টি ব্যাংক এখনো এসব আমানতের অর্থ জমা প্রদান করেনি। অভিযোগ আছে, আলোচ্য ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব সম্পদ হিসেবে এসব অর্থ ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোতে নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ১০ বছর) কোনো লেনদেন না হলে সেই হিসাবকে অদাবিকৃত আমানত হিসেবে ধরা হয়। এ ধরনের অর্থ প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের নির্ধারিত হিসাবে জমা দেওয়া হয়। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে আমানতকারীরা পরবর্তী সময় দাবি করলে ব্যাংক সেই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। ব্যাংক গ্রাহককে অর্থ পরিশোধ করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের হিসাব থেকে আবার সেই টাকা ব্যাংকের কাছে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, অদাবিকৃত আমানত বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থায়ীভাবে থেকে যায় না, বরং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের হিসাবে স্থানান্তর হয় এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় সমন্বয় করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা মিলে ৩৩টি ব্যাংকের অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় অদাবিকৃত আমানতের পরিমাণ ৪৯ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া মার্কিন ডলারে প্রায় ৪ কোটি ৪৮ হাজার ১৭০ টাকা (৩২৬২৫৮ ডলার), পাউন্ডে ২৭ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৮ টাকা (৪৬৪৮৬ পাউন্ড) এবং ইউরোতে ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৪৪০ টাকা (৫২৭৫ ইউরো)।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দাবিহীন আমানতের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কয়েকটি বড় বেসরকারি ব্যাংক। এর মধ্যে বিদেশি খাতের সিটি ব্যাংক এনএ-এর সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ কোটি টাকার দাবিহীন আমানত রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের রয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া এইচএসবিবিসির প্রায় ৬ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং সিটি ব্যাংকের প্রায় ৩ কোটি টাকার দাবিহীন আমানত রয়েছে। এসব আমানতের বড় অংশই দীর্ঘদিন অচল থাকা সঞ্চয়ী হিসাব, এফডিআর ও বিভিন্ন ডিপোজিট স্কিমে জমা টাকার হিসাব।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন