


শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৮৭নং আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়াকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। প্রধান শিক্ষক ছুটি না দেওয়ায় ও স্ত্রীর সাথে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া। পরে এই ঘটনায় ইউএনওর পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়। অপরদিকে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বাদী হয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আলী আসাদ মিয়া। তার আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যালয়ে যোগ দেন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে পাশের ছুরিরচর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয় মাসের জন্য প্রেষণে পাঠানো হয়েছিল। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবার তিনি আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন তিনি। গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ঢুকে ছুটির আবেদন করেন দেলোয়ার হোসেন। প্রধান শিক্ষক তাঁকে ছুটি না দিয়ে উল্টোপাল্টা কথা শোনাতে থাকেন তারপর দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এরইমধ্যে তার স্ত্রীর সাথে হোয়াটসঅ্যাপে অশ্লীল মেসেজ ও ঢাকায় ঘুরতে যাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হওয়ার একপর্যায়ে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে অন্য শিক্ষকেরা পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এবিষয়ে কথা হয় স্কুলের পাশের চা দোকানী জসিম আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষকের স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় জড়িত। এনিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার মিমাংসা করা হলেও প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ পূনরায় তার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং তাকে নিয়ে ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের সাথে মাঝে মধ্যেই হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন একটু সহজসরল মানুষ তার তিনটি সন্তান রয়েছে। তাদের কথা চিন্তা করে আমরা সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু প্রধান শিক্ষক কিছুদিন না যেতেই তার কাছে থাকা অশ্লীল ছবির ভয় দেখিয়ে আবারও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। এটা নিয়েই মূলত বৃহস্পতিবার সকালে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। আমি এই লম্পট প্রধান শিক্ষকের বিচার চাই।
এবিষয়ে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া বলেন, ‘ওই শিক্ষক নানা অজুহাতে স্কুল ফাঁকি দিতেন। বিভিন্ন ধরনের অশালীন আচরণ করতেন। যার কারণে তাঁকে ছয় মাসের জন্য অন্য একটি স্কুলে প্রেষণে রাখা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সে ছুটি চেয়েছিল। কিন্তু ওই দিন বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে এটিও স্যারের (থানার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) মিটিং করার কথা ছিল। তাই তাঁকে ছুটি দেওয়া হবে না বলেছিলাম। তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি আমাকে মারধর করেন। তবে তার বিরুদ্ধে উঠা পরকীয়ার অভিযোগ তিনি এড়িয়ে গিয়ে অস্বীকার করেন। এবং তিনি দাবী করেন তার ফোন চুরি করে সহকারী শিক্ষক তার ছবি ও হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এডিট করে সেগুলো সাংবাদিকদের দেখাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি আরও বলেন, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য তাকে জড়িয়ে মিথ্যে কথা বলছে। ঢাকায় নেওয়ার অভিযোগে তিনি বলেন, আমি একা গিয়েছি এবং সহকারী শিক্ষকের স্ত্রী একাই ঢাকায় গেয়েছে আমি কিছুই জানি না।
সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বছর খানেক আগে আমার পারিবারিক ঝামেলা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে মিমাংসার জন্য আমি সহযোগিতা চাই। সেখান থেকে তিনি আমার স্ত্রীর ফোন নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। বিষয়টি আমি জানতে পেরে স্কুলের সভাপতি সহ স্থানীয় কয়েকজনকে জানিয়েছি। কিন্তুু প্রধান শিক্ষক কিছুদিন না যেতেই আবারও পরকীয়ায় জড়িয়ে যায়। এরপর আমি আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স করি। পরে স্থানীয়দের কথায় আমার তিন সন্তানের কথা চিন্তা করে তার ভুল ক্ষমা করে তাকে পূনরায় বিয়ে করি। কিন্তুু মাস দুই না যেতেই আবারও আমার স্ত্রীকে অশ্লীল ছবি দেখিয়ে ব্লাকমেইল করে ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে রাত্রি যাপন করে।এই লম্পট প্রধান শিক্ষক আমার সংসার ভেঙে তছনছ করে দিয়েছেন। তাঁর কারণে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আবারও ছাড়াছাড়ি হয়েছে। শিশুসন্তানদের নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আমার ৫ বছর বয়সী ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার জন্য ছুটি চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি ছুটি না দিয়ে আমাকে উল্টাপাল্টা কথা শোনাতে থাকেন। আমি এই শিক্ষক নামের লম্পটের বিচার চাই
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মুজাহিদ বলেন, ‘দুই শিক্ষকের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পেয়ে সরেজমিন তদন্ত করেছি। এখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুবকর সিদ্দিক বলেন, শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়েছি। ইতিমধ্যেই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ করা হবে।