রবিবার
১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৭ মে ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অপচিকিৎসায় ফের মৃত্যু, ৫ লাখ টাকায় ধামাচাপার অভিযোগ

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ১০:৫০ পিএম আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

মানিকগঞ্জ ইউনাইটেড হাসপাতালে অপচিকিৎসায় ফের এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে ৫ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শুক্রবার (১৫ মে) বিকেল ৪ টা ২২ মিনিটে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনিকা নামের ঐ রোগী মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যা ৭ টায় রোগীর স্বজনেরা মানিকগঞ্জ ইউনাইটেড হাসপাতাল ঘেরাও করেন।

মৃত মোছাঃ মনিকা আক্তার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগির কামারদিয়া এলাকার ফুলচান মিয়ার স্ত্রী। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিলো ৩৮ বছর এবং তিনি দুই সন্তানের জননী ছিলেন।

এর আগে, বুধবার (১৩ মে) রাত ১০টায় মানিকগঞ্জের ইউনাইটেড হাসপাতালে অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করা হয় মৃত মনিকার। অপারেশনে সার্জন হিসেবে ছিলেন মানিকগঞ্জ ড্যাব এর সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার মোঃ জিয়াউর রহমান ও এনেস্থিসিয়া ডাক্তার ছিলেন নাসিম উদ্দিন। তবে অপারেশন এর পূর্বে শারিরীক মূল্যায়ন অর্থাৎ প্রি-এনেস্থিসিয়া চেকাপ করা হয়নি। রোগীর শরীর এনেস্থিসিয়া নেবার জন্য পুরোপুরি ফিট কি না? কিংবা রোগী অপারেশনের জন্য শারিরীকভাবে ফিট কি না? যাচাই করা ছাড়াই অপারেশন করা হয়।

পোস্টমর্টেম রিপোর্ট (মৃত্যুর কারণ জনিত মেডিকেল সার্টিফিকেট) থেকে জানা যায়, অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর অপারেশনের পর গুরুতর সংক্রমণ/সেপসিস তৈরি হয় পরবর্তীতে কিডনি বিকল হয়ে শরীরে এসিড বেড়ে যায় এবং রক্ত জমাটের সমস্যা দেখা দেয়। শরীরের তরল ও রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে hypovolemic shock হয় এবং শেষে হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে। তবে রোগীর স্বজনদের দাবী রোগী ডেংগু পজিটিভ থাকায় মারা গেছে অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর কোন সমস্যা ছিলো না।

রোগীর স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (১৩ মে) অপারেশন এর জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে আসলেও তারা কোন চেকাপ বা টেস্ট ছাড়াই অপারেশন করে। অপারেশন এর পরের দিন তারা বিভিন্ন টেস্ট করে। অবস্থা খারাপ হলে মানিকগঞ্জ মেডিকেলে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করে দায়িত্বরত চিকিৎসক। পরবর্তীতে তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে (আইসিইউ) রাখা হয়। সেখানে রোগীর অবস্থা অবনতি হয়ে শুক্রবার (১৫ মে) বিকেল ৪ টা ২২ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৭ টায় রোগীর স্বজনেরা হাসপাতাল ঘেরাও করলে হাসপাতালটির পরিচালক আবু রায়হান আল বেরুনী (রাজা) তাদের সাথে দফায় দফায় একান্ত আলাপচারিতা করেন। পরবর্তীতে রোগীর স্বজনদের সাথে ৫ লাখ টাকায় বিষয়টি মিমাংসা করেন হাসপাতালটির পরিচালক রাজা।

মৃত মনিকা আক্তারের ভাতিজা নিহাদ হোসেন বলেন, অপারেশন হয় রাত ১০ টায় কিন্তু পরের দিন সকালেই রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। হাত পায়ে রক্ত জমে যাচ্ছে, রোগীর শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তারপর ডাক্তার বলল রক্ত লাগবে ইমারজেন্সি রক্ত দিয়েছি। তারপর বলে রোগীর অবস্থা খুবি খারাপ রোগীর তো ডেঙ্গু হইছে। কিন্ত তার কাছে রিপোর্ট চেয়েছিলাম দিচ্ছি বলে দেয়নি। পরে সে অন্য একজন ডাক্তারকে ফোন দিছে তিনি বলল রোগী পানি না খাওয়ার কারনে লবনাক্ততা শুন্যতার কারণে রোগী ঘাইমা গেছে। যার কারণে রোগীর অবস্থা খারাপ। কিন্তু কোন সমস্যা নাই কিছুদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাইবো।পরে তারা ট্রান্সফার করে দিল মানিকগঞ্জ মেডিকেলে সেখান থেকে যে ডাক্তার আছে তারা বলল রোগীর অবস্থা খারাপ এখানে চিকিৎসা হবে না। এখানে রাখলে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরবর্তীতে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ট্রান্সফার করা হয় সেখানে আইসিউতে থেকে আমার ফুপি পরদিন বিকেল ৪ টায় মারা গিয়েছেন। এনাম মেডিকেল থেকে আমার ফুপির আগের সকল রিপোর্ট নষ্ট বের হইছে।

এ বিষয়ে জানতে সার্জারী ডাক্তার মোঃ জিয়াউর রহমান ও এনেস্থিসিয়া ডাক্তার নাসিম উদ্দিন এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদেরকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

মানিকগঞ্জ ইউনাইটেড হাসপাতালের পরিচালক আবু রায়হান আল বেরুনী ওরফে রাজা বলেন, এটা মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে সব টেস্ট করা এবং ফিট সার্টিফিকেট দেওয়া। সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু নেগেটিভ আসছে।

অপারেশনের আগে প্রি-এনেস্থিসিয়া চেকাপ বা শারিরীক মুল্যায়ন (অর্থাৎ ফিট) করা হয়েছিলো কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথমে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সিবিসি রিপোর্ট দেখিয়ে বলেন এটাই ফিট সার্টিফিকেট। কিন্তু এনেস্থিসিয়া ডাক্তার কর্তৃক স্বাক্ষরিত প্রি-এনেস্থিসিয়া চেকাপের কোন ডকুমেন্টস দেখাতে পারেননি।

তিনি আরো বলেন, ডাক্তাররা তো এই রিপোর্ট দেখেই অপারেশন করে। এইসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না ডাক্তার জানে।

গত আট মাস আগেও এই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে, আপনার হাসপাতালেই দুর্ঘটনা কেন ঘটছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতাল ব্যাবসা করলে দুই একটা দুর্ঘটনা ঘটেই। এইখানে আমাদের কোন দূর্বলতা নেই।

উল্লেখ্য, গত বছরের (২০২৫) ৬ সেপ্টেম্বর টনসিল অপারেশন করাতে এসে জেসমিন আক্তার নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। সেইসময়ে অভিযোগ উঠে এনেস্থিসিয়া ডাক্তার জিয়াউল হক এর অবহেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন