বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিবচরে ভুয়াদের দাপটে দিশেহারা প্রকৃত জেলে, সুবিধা নিচ্ছে ভিন্ন পেশার মানুষ

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

​গায়ে নদীর নোনা গন্ধ, হাতে জালের কড়া—অথচ খাতার পাতায় তাদের অস্তিত্ব নেই। বংশানুক্রমে যারা পদ্মার বুকে ঢেউ গুণে জীবিকা নির্বাহ করছেন, সরকারি খাতার 'জেলে' পরিচয়ে তারা আজ পুরোপুরি উদ্বাস্তু।

শিবচরের পদ্মা পাড়ে যখন নিষেধাজ্ঞা আসে, জাল গুটিয়ে ঘরে বসে থাকা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকে না। অথচ সরকারি খাদ্য সহায়তার চাল যখন বিলি করা হয়, তখন প্রকৃত জেলেদের ঘরে জ্বলে অভাবের ধিকিধিকি আলো।অন্যদিকে নদীর পানি না ছোঁয়া, ডাঙায় ব্যবসা-বাণিজ্য বা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটানো সুবিধাভোগীদের ঘরে চাল পৌঁছে যায় অনায়াসেই। তাদের কোনো দিন লাইনে দাঁড়াতে হয় না; ক্ষমতার অলিখিত দাপটে ঘরে বসেই মেলে অন্য কারো হকের রেশনের চাল।

​উপজেলা মৎস্য দফতর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬,৫৪২ জন। এর মধ্যে পৌরসভায় ২৯৯ জন এবং ইউনিয়ন পর্যায়—বন্দরখোলায় ৬৭২, সন্ন্যাসীরচরে ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণে ৩৪৫, চরজানাজাতে ৯৫১, কাঁঠালবাড়িতে ৪২১, মাদবরের চরে ২৮৭, বহেরাতলা উত্তরে ৮৯, ভান্ডারীকান্দিতে ২২০, বাঁশকান্দিতে ৫৬৪, নিলখীতে ৪৮৮, শিরুআইলে ৩৫৩, দত্তপাড়ায় ৪৩২, কাদিরপুরে ২৮৫, কুতুবপুরে ১৯৬, পাঁচ্চরে ১৫৪, দ্বিতীয়খন্ডে ১৬৩, উমেদপুরে ১৬৬ এবং ভদ্রাসনে ২৭৬ জনকে 'প্রকৃত জেলে' হিসেবে সরকারি খাতায় অন্তর্ভুক্ত করে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এ তালিকা হালনাগাদ করার নিয়ম রয়েছে এবং এ জন্য একটি উপজেলা কমিটিও বিদ্যমান। তবে মৎস্য বিভাগের দাবি, মূল তালিকা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই। অবশ্য খুব শিগগিরই তা পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন তারা।

​চরজানাজাত ও কাঁঠালবাড়ি এলাকার প্রবীণ মৎস্যজীবীরা জানান, দুই-তিন পুরুষ ধরে পদ্মায় মাছ ধরে সংসার চালালেও তালিকায় তাদের নাম ওঠেনি। ফলে কোনো সুবিধা পান না তারা। বিপরীতে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ভ্যানচালক কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীরা কার্ড বাগিয়ে নিয়মানুযায়ী রেশনের চাল তুলে নিচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের মতে, তালিকায় কয়েক হাজার ভুয়া নাম ঢোকানো হয়েছে, যার কারণে বাদ পড়েছেন শত শত প্রকৃত মৎস্যজীবী।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খা, ইলিয়াস বেপারী, বাচ্চু মোড়লসহ বিভিন্ন এলাকার পেশাদার নন—এমন অনেকেই তালিকাভুক্ত জেলে। বাস্তবে তারা নিজেদের জমিতে টুকটাক কৃষিকাজ করেই দিন কাটান, অথচ প্রতিবার নিয়ম করে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন।

​পদ্মার বুকে জাল টেনে জীবিকা নির্বাহ করা চরজানাজাতের ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের খোকন হাওলাদার ও ৩নং ওয়ার্ডের বজলু খা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বংশপরম্পরায় তারা নদীতে থাকলেও নিজেদের বা পরিবারের কারও জেলে কার্ড নেই। মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ঘনিষ্ঠ বা প্রভাবশালী না হলে কার্ড মেলে না বলে তাদের অভিযোগ।

​স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, দিনরাত নদীতে থাকার কারণে কখন কীভাবে তালিকা তৈরি হয়, তারা জানতেই পারেন না। উপরন্তু, মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কাছে তদবির বা বাড়তি লেনদেনের সুযোগ না থাকায় প্রকৃত শ্রমজীবীদের নাম বাদ পড়ে যায়, আর অর্থ বা ক্ষমতার জোরে অনিয়মের মাধ্যমে ভুয়া জেলেরা সেই জায়গা দখল করে নেয়।

​​অভিযোগের বিষয়ে শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার জানান, তালিকায় কোনো অ-জেলে বা অযোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হলে তদন্ত করে তাদের নাম ছেঁটে ফেলা হবে। পাশাপাশি, বর্তমানে নদীতে সক্রিয় থাকা প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নতুন তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে; যাচাই-বাছাই শেষে কেবল প্রকৃতদেরই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

​এ ব্যাপারে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম. ইবনে মিজান বলেন, "যার হাতে জাল আছে, তিনিই প্রকৃত জেলে।" অন্য কোনো পেশার মানুষের এই তালিকায় থাকার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, মৎস্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পুরো তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। অযোগ্যদের বাদ দিয়ে প্রকৃত জেলেদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank