রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে কমছে না বন্যার দুর্ভোগ, খাবার-সুপেয় পানির জন্য হাহাকার

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
expand
কক্সবাজারে কমছে না বন্যার দুর্ভোগ, খাবার-সুপেয় পানির জন্য হাহাকার

একটানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত কক্সবাজারে দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। শনিবার ভোরে বৃষ্টি কিছুটা থেমে থাকায় অনেকের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল, হয়তো এবার নামতে শুরু করবে বন্যার পানি। কিন্তু সেই আশা দুপুর গড়াতেই ভেঙে যায়। আবারও শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। ফলে প্লাবিত এলাকার পানি কমার বদলে আরও বাড়তে থাকে। নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আগেই পানিবন্দি থাকা মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়েছে।

সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে খাবার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। কোথাও রান্না করার মতো শুকনো জায়গা নেই, কোথাও বিশুদ্ধ পানির উৎস ডুবে গেছে। নৌকা কিংবা ঠেলাগাড়িতে করে মানুষ খাবারের সন্ধানে ছুটছেন। সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হলেও দুর্গত মানুষের তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা নৌকায় করে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে। খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি ওষুধ, মোমবাতি ও নিরাপদ পানিও বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে, বন্যার মধ্যে আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার অবসান ঘটেছে। ঈদগাঁও ও রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী হাসনাকাটা এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী মাদরাসাছাত্র সাজেদের মরদেহ চারদিন পর উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার সকালে ফুলেশ্বরী নদীর ঈদগাঁওয়ের গজালিয়া এলাকায় ভাসমান অবস্থায় স্থানীয়রা মরদেহটি দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন।

ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল জাহান চৌধুরী জানান, নিহত সাজেদ ঈদগড় ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাসনাকাটা কুনারপাড়া এলাকার মো. নুরুল ইসলামের ছেলে। সে চরপাড়া নুরানি মাদরাসার শিক্ষার্থী ছিল। গত ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ফুলেশ্বরী খালের প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে সে নিখোঁজ হয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে জেলায় ৩০ লাখ টাকা এবং সাড়ে ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন টিম দুর্গত দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কাছে ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে।

শনিবার দুপুরে পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন এবং ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেই কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, শনিবার দিনের বেলায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমেছে এবং মাতামুহুরী নদীর পানিও উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী একদিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বাংলাপাড়া, চকরিয়ার পূর্ব বড়ভেওলার বেতুয়া বাজার স্টেশন এবং কোনাখালী ইউনিয়নের মরংগুনা এলাকায় পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্যসামগ্রী, নিরাপদ পানি, ওষুধ ও মোমবাতি বিতরণ করেন। এ সময় পেকুয়া ও চকরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

গত ৪ জুলাই রাত থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া, চকরিয়া ও পেকুয়াসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা প্লাবিত হয়ে পড়ে। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষ করে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু পানি। ডুবে গেছে বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি, মৎস্যঘের ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বহু পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামুর কাঠিরমাথা, চাইল্যাতলীসহ কয়েকটি এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক এখনো পানির নিচে রয়েছে। ফলে ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান জানান, সপ্তাহজুড়ে টানা বর্ষণে উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে। তাদের জন্য ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয়ের পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান বলেন, বন্যায় জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন এবং বিভিন্ন ঘটনায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিতরণের জন্য ইতোমধ্যে ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ২০ লাখ টাকা ও ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। রোববার অথবা সোমবার এসব ত্রাণ উত্তোলনের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিতরণ করা হবে।

তিনি জানান, দুর্গত মানুষের চাহিদা বিবেচনায় জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত এক হাজার প্যাকেট শুকনা খাবারের জন্যও আবেদন করেছে। তবে এখনো সেই বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে সন্ধ্যার পর আবারও টানা অতিভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় রাতের পর্যবেক্ষণে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসনের আশা, বৃষ্টি কমে এলে ধীরে ধীরে পানি নামতে শুরু করবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, হাজারো পানিবন্দি মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা। পানি না নামা পর্যন্ত কক্সবাজারের লাখো মানুষের দুর্ভোগ কাটার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS Spain
Scheduled
15 Jul, 01:00 AM
VS
World Cup