বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দূষণে হারাচ্ছে জীবিকা, ঋণের বোঝায় পেশা বদলাচ্ছেন কৃষক-জেলেরা

তালতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
expand
তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

বরগুনার সমুদ্রঘেঁষা তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজানপাড়া। একসময় কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এই জনপদে মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন ছিল ধান, মরিচ, শাকসবজি, ডাব, তাল, পেয়ারা আর নদী-সাগরের মাছ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালে নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অঙ্কুজানপাড়ায় ৩৫০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পর থেকে এলাকার পানি, মাটি ও বায়ুর পরিবেশে পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীবিকা হারিয়ে অনেক মানুষ পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে মাছ ও কৃষি উৎপাদন কমেছে এমন দাবির পক্ষে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ ও পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে নদীর পানির তাপমাত্রা, পানির গুণগত মান, মাটির উর্বরতা, বায়ুর মান এবং জলজ বাস্তুতন্ত্র নিয়ে সমন্বিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তালতলী বাজারের এক পাশে ছোট্ট ঠেলাগাড়িতে বরফ, লেবু, চিনি ও পানির বোতল সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় ছিলেন বড় অঙ্কুজান গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ্ব ইউসুফ হোসেন হাওলাদার। কয়েক বছর আগেও যিনি ছিলেন কৃষক, এখন জীবিকার প্রয়োজনে তিনি শরবত বিক্রি করেন।

ইউসুফ হোসেন বলেন, চাষ করে আর সংসার চলছিল না। কয়েক বছর ধরে জমিতে ফলন কমে গেছে। চাষের খরচই উঠত না। বয়স হয়েছে, তাই ঢাকায় গিয়ে কাজ করার সুযোগও নেই। বাধ্য হয়ে শরবতের ব্যবসা শুরু করেছি।

ইউসুফের মতো পেশা পরিবর্তনের ঘটনা এখন এলাকায় বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, কৃষি ও মৎস্য খাতে আয় কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ও জেলে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে গিয়ে অটোরিকশা চালানো, হকারি, দিনমজুরি কিংবা অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ঋণের চাপ সামলাতে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

তালতলীর জেলে হাবিব খানের গল্পও একই রকম। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর আগে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে তিনি তালতলী ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। বর্তমানে সেখানে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধ করছেন বলে জানান তার পরিচিতজনরা।

মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মুহিব্বুল হাওলাদারের অবস্থাও একসময় সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। নিজের মাছ ধরার নৌকা থাকলেও সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় তিনি কয়েক লাখ টাকা ঋণের চাপে পড়েন। পরে জীবিকার প্রয়োজনে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। দীর্ঘদিন পর অন্য পেশায় আয় করে ঋণের বড় অংশ পরিশোধ করে আবার এলাকায় ফিরে আসেন তিনি।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, একসময় পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মোহনা ছিল ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। এখন আগের তুলনায় মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ফলে মাছ ধরার নৌকা ঘাটে পড়ে থাকছে, আর যারা সাগরে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছেন না।

নিবন্ধিত জেলে মো. শাহীন বলেন, আগে এই মোহনায় প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন মাছ অনেক কম। আমরা মনে করি, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহৃত গরম পানি নদীতে গেলে মাছের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘তিন বছর ধরে মাছের সংকট চলছে। অথচ মহাজনের ঋণ বাড়ছে। সংসার চালাতে গরু বিক্রি করতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো আমাকেও একদিন গ্রাম ছাড়তে হবে।

বরগুনা জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মাছ আহরণ ও অবতরণের পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, দুই বছর আগে পাথরঘাটা ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টারে বিভিন্ন ধরনের মাছ অবতরণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার টন। গত এক বছরে তা কমে প্রায় ৭৬ হাজার টনে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, বরগুনায় মাছ উৎপাদন ও আহরণের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অনেক ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকার মালিক এখন সাগরে যেতে আগ্রহী নন। কারণ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য, গরম পানি বা অন্যান্য তরল পদার্থ নদীতে নিঃসৃত হলে জলজ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে মাছের প্রজনন ও বিচরণেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জানতে গবেষণা প্রয়োজন।

মৎস্যের পাশাপাশি কৃষিতেও সংকটের কথা বলছেন স্থানীয়রা। তালতলীর বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান, মরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজির পাশাপাশি ডাব, তাল ও পেয়ারা উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, কেন্দ্রের বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ আশপাশের জলাশয় ও কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ার কারণে মাটির গুণগত মানে পরিবর্তন এসেছে।

তবে এসব দাবির বৈজ্ঞানিক সত্যতা যাচাইয়ে এখনো পর্যাপ্ত স্বাধীন গবেষণা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় গরু-ছাগলের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, দূষিত পরিবেশ ও সম্ভাব্য দূষিত ঘাস খাওয়ার কারণে কিছু গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় গৃহিণী সুফিয়া বেগম বলেন, এ এলাকায় এখন প্রায়ই গরু অসুস্থ হওয়ার কথা শুনি। চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা লাগে। অনেক পরিবার সেই খরচও ঋণ করে জোগাড় করে।

তবে গবাদিপশুর মৃত্যুর সঙ্গে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশগত প্রভাব শুধু পানি ও মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়, বায়ুদূষণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. খোরশেদ আলম।

তিনি বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বাতাস, পানি ও মাটিতে দূষণকারী উপাদানের উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে জনবসতি ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তার মতে, তালতলীর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয়দের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে পরিবেশগত ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, নদী ও সাগরের মোহনার মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগে বিস্তৃত পরিবেশগত সমীক্ষা জরুরি।

তিনি বলেন, এ ধরনের প্রকল্পের প্রভাব শুধু কেন্দ্রের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে না। নদী, সাগর, কৃষিজমি ও মানুষের বসতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত পানি যথাযথভাবে পরিশোধন ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের পর নির্গমন করা গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত উষ্ণ পানি সরাসরি নদীতে গেলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল, প্রজনন ও বিচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তালতলীর স্থানীয়দের অভিযোগ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর পর থেকে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কমেছে, মানুষের জীবিকা সংকুচিত হয়েছে এবং পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা, অতিরিক্ত মাছ আহরণ, পানির লবণাক্ততা, সামুদ্রিক পরিবেশের পরিবর্তনসহ একাধিক কারণও মাছ ও কৃষি উৎপাদন কমার জন্য দায়ী হতে পারে।

তাই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে তালতলীর পরিবেশ ও মানুষের জীবিকায় কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা নির্ধারণে স্বাধীন ও স্বচ্ছ বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখন সময়ের দাবি।

নদীর পানির তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গুণাগুণ, বায়ুর মান, মাটির উর্বরতা, মাছের প্রজনন ও বিচরণ এবং স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য সবগুলো বিষয়কে একই গবেষণার আওতায় এনে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

তালতলীর মানুষের প্রত্যাশা উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হবে। কারণ এই উপকূলের মানুষের কাছে নদী, সাগর, কৃষিজমি ও প্রকৃতি শুধু জীবিকার উৎস নয়, এগুলোই তাদের জীবন ও ভবিষ্যতের ভিত্তি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন