

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কেউ নতুন করে জীবন শুরু করেন, আবার কেউ বেছে নেন নিভৃত কোনো পথ। তবে ঝালকাঠির এক যুবকের জীবনগল্প যেন ব্যতিক্রমী। তরুণ বয়সে ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর গত ১৫ বছর ধরে জঙ্গলে একাকী বসবাস করছেন তিনি। মানুষের কোলাহল থেকে দূরে, গাছগাছালিতে ঘেরা নির্জন পরিবেশে নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন কাঁদামাটির একটি ঘর, কেটেছেন একটি ছোট পুকুর এবং তৈরি করেছেন নিজের ছোট্ট এক জগৎ। ঝালকাঠি সদর উপজেলার শ্রীমন্তকাঠি গ্রামের বাসিন্দা পলাশ বড়াল (৩৯) বর্তমানে এলাকায় এক পরিচিত মুখ। স্থানীয়দের কাছে তিনি দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গলে একাকী বসবাসকারী মানুষ হিসেবেই পরিচিত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘন সবুজে ঘেরা একটি নির্জন স্থানে কাঁদামাটি দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করছেন পলাশ। ঘরের চারপাশে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। পাশেই রয়েছে তার খনন করা একটি ছোট পুকুর। সেখানেই কাটছে তার দিন-রাত।
স্থানীয়রা জানান, তরুণ বয়সে পাশের গ্রামের এক কিশোরীর প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল পলাশের। একপর্যায়ে তিনি ওই কিশোরীকে নিজের মনের কথা জানান এবং প্রেমের প্রস্তাব দেন। কিন্তু কিশোরী তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সেই ঘটনার পর থেকেই পলাশ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেন। একসময় তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে জঙ্গলে বসবাস শুরু করেন।
গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানান, পলাশকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করা হয়েছে। একপর্যায়ে পারিবারিকভাবে তার বিয়ের ব্যবস্থাও করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল, সংসার জীবন শুরু করলে তিনি হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। কিন্তু জঙ্গলে বসবাস এবং একাকী জীবনযাপনের কারণে বিয়ের মাত্র এক বছরের মধ্যেই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকে আরও বেশি নিভৃতচারী হয়ে ওঠেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা অরুন ও শহিদ বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই পলাশকে চিনি। অনেকবার তাকে বাড়িতে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সে জঙ্গল ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে রাজি হয়নি।” আরেক বাসিন্দা উৎপল বলেন, “সে কারও কোনো ক্ষতি করে না। নিজের মতো করে থাকে। এলাকার মানুষ তার জন্য সহানুভূতি বোধ করে।” তবে নিজের বর্তমান অবস্থার জন্য কাউকে দায়ী করেন না পলাশ বড়াল। তিনি বলেন, “আমি কাউকে দোষ দেই না। সবই আমার ভাগ্যের লেখা। মানুষের প্রতি আমার কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। এখানেই আমি শান্তি পাই, তাই এখানেই থাকি।”
বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী পলাশ বড়াল তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তৃতীয়। এলাকাবাসীর ভাষ্য, তিনি মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন হলেও কখনো কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন না। তার ব্যতিক্রমী জীবনযাপন দেখতে ও তার গল্প শুনতে প্রায়ই বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করেন। একটি প্রত্যাখ্যাত প্রেম যে একজন মানুষের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, পলাশ বড়ালের জীবন যেন তারই এক নীরব উদাহরণ।