

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নরসিংদীর আলোচিত কিশোরী সুমনা আক্তার তিথি হত্যা মামলায় দুই সন্দেহভাজনকে ধরতে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে পাত্রপক্ষ সেজে অভিযান চালায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই অভিযানে গ্রেপ্তার হন দুই সহোদর রমজান আলী (লিমন) ও হাসিবুর রহমান (শান্ত)। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে উঠে আসে, প্রবাসী স্বজনের পাঠানো টাকার লোভে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।
পিবিআই ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে নরসিংদী সদর উপজেলার শেখেরচর গ্রামে নিজ বাড়িতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয় ১৩ বছর বয়সী সুমনা আক্তার তিথিকে। হামলায় গুরুতর আহত হন তার মা আসমা আক্তার। এ সময় বাড়ি থেকে নগদ টাকাও লুট করা হয়।
ঘটনার চার দিন পর, ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে ফরিদপুরের বোয়ালমারী থেকে রমজান ও হাসিবুরকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কাউছার মিয়া ও ইমন আলীকে। চার আসামিই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলায় অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে এবং বিচার শুরু হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই নরসিংদীর পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। তাতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। বিচার শুরু হয়েছে। মামলার শুনানি চলছে।’
তদন্তকারীরা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকে দৃশ্যমান কোনো সূত্র ছিল না। বাড়ির আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না পাওয়ায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। এ অবস্থায় নিহত তিথির বাবা মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলে পরিবারের আর্থিক লেনদেন, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সেখানেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। মোফাজ্জল হোসেন জানান, তার বড় মেয়ে ও কম্বোডিয়াপ্রবাসী জামাতা নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা তোলার কাজে সহায়তা করতেন তাদের পরিচিত হাসিবুর রহমান শান্ত। এই তথ্যের পর হাসিবুরের মুঠোফোনের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ শুরু করে পিবিআই। তাতে দেখা যায়, হত্যার রাতে তিনি নরসিংদীতে ছিলেন এবং পরদিন ভোরে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে যান। একই সময়ে আরেকটি তথ্য আসে, রমজান আলী বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে যাচ্ছেন। এরপর তার গতিবিধিও নজরদারিতে আনা হয়।
সুমনা আক্তারকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই অর্থ উদ্ধার করা হয়
পিবিআই কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর ও নরসিংদীতে কয়েক দিনের অনুসন্ধান, মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং আত্মীয়স্বজনের সূত্র ধরে তারা নিশ্চিত হন, রমজান ও হাসিবুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এরপর বোয়ালমারীতে গিয়ে একজন কর্মকর্তা পাত্র সেজে একটি বাড়িতে যান। কথোপকথনের একপর্যায়ে জানা যায়, যাঁদের খোঁজা হচ্ছে তারা ওই বাড়িতে নেই, আছেন আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে। এই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা থাকার খবর পান রমজান। বড় ভাই হাসিবুরের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, মোফাজ্জলের বড় মেয়ে ও জামাতা বিদেশ থেকে নিয়মিত টাকা পাঠান। এরপর টাকার লোভে ডাকাতির পরিকল্পনা করেন রমজান। পরিকল্পনায় তিনি সঙ্গে নেন কাউছার মিয়া ও ইমন আলীকে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্থানীয় বাজার থেকে একটি হাতুড়ি ও রশি কেনা হয়।
জবানবন্দির তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে রমজান, কাউছার ও ইমন মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে যান। তখন মোফাজ্জল বাড়িতে ছিলেন না। রমজান দরজায় কড়া নাড়লে তিথি দরজা খোলে। দরজা খোলার পরই তার মুখ চেপে ধরা হয়। তিথি চিৎকার করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। মেয়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে মা আসমা আক্তারের ওপরও হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই তিথির মৃত্যু হয়।
এরপর হামলাকারীরা বাড়িজুড়ে টাকা খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে একটি লাল রঙের বালতিতে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় রাখা নগদ টাকা পেয়ে তা একটি স্কুলব্যাগে ভরে দ্রুত পালিয়ে যায়।
পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রবাসী স্বজনের পাঠানো টাকার লোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানের সমন্বয়ে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।’
নরসিংদীর শেখেরচর এলাকায় ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারির এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। তদন্ত শেষে চারজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
