


পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোয় আলোকিত ঐতিহ্যবাহী জনপদ মাদারীপুরের শিবচর। আর এই অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ইবাদতের অন্যতম কেন্দ্রস্থল শিবচর চকবাজার জামে মসজিদ।
বিগত প্রায় সাত বছর এই মসজিদের খতিব হিসেবে আসীন ছিলেন এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবনধারা, আচরণ এবং আকস্মিক প্রস্থান নিয়ে বর্তমানে স্থানীয় জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি বি এস এল মুফতী মুস্তাফিজুর রহমান কাফী।
নিজেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্কলার, 'গ্লোবেট্রোটার' বা বিশ্ব পরিব্রাজক এবং সুইজারল্যান্ডের পাসপোর্টধারী দাবী করা এই ব্যক্তি কেন এবং কী উদ্দেশ্যে মাত্র ২০ হাজার টাকা মাসিক বেতনে মফস্বলের একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন -তা এখন শিবচরে ‘টক অব দ্য টাউন’।
সম্প্রতি স্থানীয় আলেম সমাজের শরয়ী তদন্তের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে তাঁর আকস্মিক পদত্যাগ ও চলে যাওয়া এই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বৈশ্বিক মহামারী করোনাকালীন সংকটের সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে শিবচরে আগমন ঘটে এই ব্যক্তির। আরবী ও ইংরেজী ভাষায় পারদর্শী এবং প্রখর বাকপটু এই বক্তা অতি দ্রুত তাঁর আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি দিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মুগ্ধ করেন। অল্প দিনেই তৈরী করেন একটি নিজস্ব অনুসারী বলয়। তবে দীর্ঘ প্রায় সাত বছরের মতো সময় অবস্থান করলেও তিনি স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম বা ইমাম সমিতির সাথে কোনো ধরনের সাংগঠনিক বা পেশাগত সুসম্পর্ক রাখেননি। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এই খতিবের ব্যবহৃত ভিজিটিং কার্ডের কিউআর কোড স্ক্যান করে পাওয়া গেছে এক অবিশ্বাস্য আত্মপ্রচারের বিবরণ। সেখানে তিনি নিজেকে ‘আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন স্কলার, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব, প্রকৃত গ্লোবেট্রোটার এবং ইনভেস্টিগেটর’ হিসেবে দাবি করেছেন।
শুধু তাই নয়, ওই বিবরণী অনুযায়ী- তিনি সুইজারল্যান্ড, জার্মানী, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ফিনল্যান্ডের মতো পরাশক্তি দেশের একাধিক ‘ভিআইপি পাসপোর্ট’ ব্যবহার করে থাকেন এবং ইউরোপের একাধিক দেশের নাগরিকত্বের অধিকারী। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি, হেলিকপ্টার ও নিজস্ব বিমান রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
কুরআন ও বিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি ডিগ্রিধারী দাবি করা এই ব্যক্তি বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ‘লেকচারার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর ‘ডায়মন্ড ব্যবসাসহ’ বিস্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ আছে।
সচেতন মহলের প্রশ্ন যার নিজস্ব বিমান, হেলিকপ্টার, ডায়মন্ডের ব্যবসা এবং পাঁচ দেশের ভিআইপি পাসপোর্ট রয়েছে, তিনি কোন অদৃশ্য আকর্ষণে মফস্বল শহরে মাত্র ২০ হাজার টাকা বেতনের ইমামতিতে সাত বছর কাটিয়ে দিলেন? এই আত্মপ্রচার কি কেবলই কোনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, নাকি এর পেছনে কোনো ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল—তা নিয়ে জনমনে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পবিত্র রমজান মাসে মাগরিবের নামাজ নিজে না পড়ানো এবং প্রতি শীত মৌসুমে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ছুটিতে থাকাসহ নিয়মিত দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে ওই খতিবের বিরুদ্ধে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেক মুসল্লি তাঁর পেছনে সালাত আদায় বন্ধ করে দেন। এ নিয়ে পরবর্তীতে মুয়াজ্জিন আপত্তি তুললে উভয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরী হয়।
এরই এক পর্যায়ে গত রমজান মাসে খতিবের মোবাইলে আসা একটি রহস্যময় ক্ষুদে বার্তাকে (এসএমএস) কেন্দ্র করে পুরো ঘটনার দায় চাপানো হয় মুয়াজ্জিনের ওপর।
এই অভিযোগে মুসল্লিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৭ বছরের চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন মুয়াজ্জিন। আর খতিব সাহেবও এই বিতর্কের মধ্যেই গত ঈদ উল ফিতরের নামাজ পড়িয়ে ছুটিতে চলে যান।
এ বিষয়ে শিবচর ইমাম সমিতির সভাপতি মো. বজলুর রহমান আরেফী জানান, সংশ্লিষ্ট খতিবের বিরুদ্ধে ওঠা নানাবিধ অভিযোগ সম্পর্কে তাঁরা অবগত রয়েছেন। বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে তিনি চকবাজার জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদকের মাধ্যমে একটি প্রস্তাব পাঠান।
প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় পাঁচজন বিশিষ্ট আলেম ওই খতিবকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করবেন এবং তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে এই প্রস্তাব পাওয়ার পর, ছুটিতে থাকা অবস্থাতেই একটি ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা জানান।
ইমাম সমিতির সভাপতি আরও অভিযোগ করেন, উক্ত খতিব স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতেন না এবং ইমাম সমিতির সদস্যও হননি। সর্বদা নিজের ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা ওই খতিব সুইজারল্যান্ডের পাসপোর্টধারী বলেও দাবী করতেন।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে চকবাজার জামে মসজিদের সদ্য অব্যাহতি নেওয়া ইমাম (বি এস এল মুফতি মুস্তাফিজুর রহমান কাফী ) এর ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
তবে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর দু'টি বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তাঁর মুঠোফোনে ৫টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রশ্ন উল্লেখ করে একটি লিখিত বার্তা (এসএমএস) প্রেরণ করা হয়। কিন্তু ইমাম সাহেবের পক্ষ থেকে সেই বার্তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি এবং তিনি বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন সে বিষয়েও স্থানীয়ভাবে কোনো সঠিক তথ্য মেলেনি। ফলে তার কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অমুসলিমদের ছদ্মবেশী ইমামতি ও সাধারণ মুসল্লিদের করণীয় নিয়ে মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবির বক্তব্য:
ধর্মীয় অঙ্গনে সাধারণ মুসলমানদের সচেতন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন বিশিষ্ট আলেম ও গবেষক শাইখ আল্লামা মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশ-বিদেশে ছদ্মবেশে ভিন্ন ভাবাদর্শী বা অমুসলিমদের ইমামতি করার কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ মুসল্লিদের করণীয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।
মুফতী গুনবি জানান, এ ধরনের ছদ্মবেশীদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে; যেমন তারা লাল বা ভিআইপি পাসপোর্ট ব্যবহার করে, স্থানীয় ওলামায়ে কেরামের সাথে কোনো সুসম্পর্ক বজায় রাখে না এবং সর্বদা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করে।
এমতাবস্থায়, কোনো মুসল্লি যদি না বুঝে বা অজান্তেই এমন কোনো ছদ্মবেশী (যার ইসলামী আকীদা বা পরিচয় সঠিক নয়) ব্যক্তির পেছনে নামাজ আদায় করে ফেলেন, তবে সেই নামাজের হুকুম কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি গুনবি বলেন, "যেহেতু ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান ও সঠিক আকীদা বহির্ভূত ব্যক্তির পেছনে নামাজ শুদ্ধ হয় না, তাই অজ্ঞতাবশত পড়া হলেও পরবর্তীতে ঐ সব ফরজ এবং ওয়াজিব নামাজের কাজা পর্যায়ক্রমে আদায় করে নেওয়া সতর্কতামূলক ও নিরাপদ।"
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিতর্কের মুখে পড়া ঐ খতিবের বিষয়ে শিবচর চকবাজার জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান খান জানান, খতিব সাহেব স্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সুসম্পর্ক রাখতেন না।
শেষ দিকে তিনি তদবির বা তাবিজ-কবজ দেওয়া শুরু করলে ভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীরাও মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন, যা স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। তবে দীর্ঘ সাত বছর তিনি এখানে দায়িত্ব পালন করলেও ঐ খতিবের কোনো ছবি বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি মসজিদ কমিটির দপ্তরে জমা নেই।
তিনি আরও বলেন, খতিব সাহেব ছুটিতে গিয়ে তাঁকে নিয়ে তৈরী হওয়া বিতর্কের কারণে গত ৮ এপ্রিল '২৬ ইং তারিখে একটি ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তিনি আর চাকরিতে ফিরবেন না বলে কমিটিকে অবহিত করেছেন।