শনিবার
১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৬ মে ২০২৬, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানিহীন পদ্মায় মাঝ নদীতেও বালুচর

রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
পদ্মার বালুচর
expand
পদ্মার বালুচর

নদীর প্রবাহ দুই ভাগ হয়ে গেছে। অল্প কিছু পানি প্রবাহিত হচ্ছে বাঁ তীর দিয়ে। আর এর চেয়ে একটু বেশি পানির প্রবাহ ডান তীরে। মাঝের অংশের পুরোটিই ধু-ধু বালুচর। এভাবেই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে রাজশাহীর পদ্মা নদী। নদীর বেশিরভাগ অংশেই হাঁটুপানিও মিলছে না। পানির প্রবাহ না থাকায় সংকটে পড়েছেন জেলে, মাঝি ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িত মানুষ। সেচ সংকটে রয়েছেন দেশের প্রায় দুই কোটি কৃষক।

নদী গবেষকেরা বলছেন, নদীর এমন করুণ চিত্রের একমাত্র কারণ উজানে নির্মিত ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ। এই ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গা নদী থেকে অব্যাহতভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের পদ্মা নদী। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ডিসেম্বরে। এবার চুক্তির নবায়নের সময় পদ্মায় পানি নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

রাজশাহী শহরের ওপারে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর মাজারদিয়াড়ে বাড়ি ফুরকন আলীর। ষাটোর্ধ্ব ফুরকন আলী বলেন, ‘২০ বছর আগেও কয়েক মাইল দূর থেকে পদ্মার ডাক শোনা যেত। সেই ডাক আর বহুদিন শুনি না। নদীর ডাক আসবে কীভাবে, পানিই তো থাকে না। বছরে চারমাসের মতো পানি থাকে। তারপর নদী শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়।’

নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, প্রতিবছর জুন মাসের দিকে নদীতে একটু একটু করে পানি বাড়ে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নদী পানিতে ভরে থাকে। তারপর শীত শুরু হতে হতেই চর পড়তে থাকে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার খইবুর রহমান জানান, গতবছরের ১৩ আগস্ট ভরা মৌসুমে রাজশাহীর টি-গ্রোয়েন এলাকায় পানির সর্বোচ্চ উচ্চতা হয়েছিল ১৭ দশমিক ৪৯ মিটার। শুক্রবার (১৫ মে) একই স্থানে পানির উচ্চতা পাওয়া গেছে ৮ দশমিক ১১ মিটার।

ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উদযাপন কমিটির তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির পর বাংলাদেশে গঙ্গার পানির অংশ দাঁড়িয়েছে সেকেন্ডে ২০ হাজার কিউসেকের কম। অথচ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশ ৭০ হাজার কিউসেকের চেয়ে কম পেতো না। এখন নদীতে সারাবছর পানির প্রবাহ না থাকার কারণে উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষ সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষ ও এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার নৌপথ। পদ্মায় পানি না থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নামছে। তাই হাজার হাজার হস্তচালিত পাম্প অকেজো হয়ে গেছে।

গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ হয়েছিল। সেদিন রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দান থেকে লং মার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে ঐতিহাসিক জনসভার মাধ্যমে শেষ হয়। মওলানা ভাসানী সেদিন ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ বলে উল্লেখ করেন। এরই ফলশ্রুতিতে ভারত ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি নিয়ে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এই চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ উপযুক্ত পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছিল। এই চুক্তি শেষ হলে ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদি নতুন চুক্তি হয়। কিন্তু এই চুক্তিতে বাংলাদেশ লাভবান হয়নি।

এবার ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ১৯৭৭ সালের মতো চুক্তি করার তাগিদ দিচ্ছেন রাজশাহীর নদীগবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানি পেত। কিন্তু পরের চুক্তিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। দেশেও নতুন সরকার এসেছে। তাই আমাদের প্রত্যাশা ১৯৭৭ সালের মতো একটি চুক্তি করতে হবে। যাতে গঙ্গার পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। নদীতে পানি না থাকলে সরকারের নতুন উদ্যোগ পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পও হুমকিতে পড়বে।

এদিকে পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আজ রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে বিভাগীয় সমাবেশ করবে ‘১১ দলীয় ঐক্য’। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। থাকবেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও।

এছাড়া ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উদযাপন কমিটিও বিকেলে নগরের বড়কুঠি পদ্মার পাড়ে গণজমায়েত করবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। প্রধান বক্তা থাকবেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম রফিকুল ইসলাম। অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখবেন আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার, ভাসানী পরিষদের সদস্য সচিব আজাদ খান ভাসানী, নদীগবেষক মাহবুব সিদ্দিকী প্রমুখ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন