


১৯১১ সালের আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউটের মতে,"প্রতিবেশী দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদ -নদীর পানি উৎসের দেশটি এমন ভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না যাতে প্রতিবেশী দেশের কোন ক্ষতি হয়।"
১৯৫১ সালে ফারাক্কা বাধের কাজ শুরু হলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রতিবাদ করে। ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর পাকিস্তান এ বিষয়ে ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর ১৯৫২ সালের ৮ মার্চ ভারত উত্তরে জানায় যে "প্রকল্পটি প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে, পাকিস্তানের উদ্যোগ সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। এরপর থেকে ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে ১৯৫৭, ১৯৫৮, ১৯৬০, ১৯৬১, ১৯৬২, ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবুও থেমে থাকেনি ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ।
বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ মাইল দূরে গঙ্গা নদীর উজানে এই ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের মে মাসে ৫ দিনের জন্য ভারতের দিল্লি গমন করেন। ১৬ই মে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। জানা যায় সেই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ি ভারতকে দেয়া হয়েছিল এবং একই সঙ্গে দেয়া হয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালু করার প্রশ্নে বাংলাদেশের সম্মতি।
১৭ মে এক বিবৃতির মাধ্যমে মাওলানা ভাসানী তথাকথিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং ভারতকে বেরুবাড়ি না দেয়ার জন্য দাবি জানান। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেশে থাকার জন্য তিনি এক মাসের জন্য তার ইংল্যান্ড সফর স্থগিত করেন। ভারতের তৎকালীন কৃষি ও শেষমন্ত্রী মিস্টার জগতজীবন রামের নেতৃত্বে ভারতীয় দল এবং বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের নেতৃত্বে প্রতিনিধির দল ৭৫ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল গঙ্গার পানি বন্টন সম্পর্কে একটি এডহক চুক্তি সম্পাদন করেন।
ভারত ১৯৭৫ সালের একুশে এপ্রিল থেকে ৩১ শে মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ২১ এপ্রিল ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পরদিন থেকে থেকে ৩০ শে এপ্রিল পর্যন্ত ১১ হাজার কিউসেক পানি পাবে। অনুরূপভাবে পরবর্তী ১০দিন অর্থাৎ ১ মে থেকে ১০ মেয়ে পর্যন্ত ১২হাজার কিউসেক, ১১ মে থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১৫ হাজার কিউসক এবং ২১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ১৬ হাজার কিউসে পানি পাবে।
কিন্তু ৪১ দিনের সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সাথে কোন সমঝোতা বা যুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে এক তরফা ভাবে পানি নিয়ে যায়। এর ফলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। এ সময় এটাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দেশের বিভিন্ন জাতীয় সংগঠন গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফারাক্কা বিষয়টি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে গভীর উদ্যোগ প্রকাশ করে সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রদান করে।
মাওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ২০শে মার্চ পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান বলেন "ভারত ফারাক্কায় পানি প্রত্যাহার বন্ধ না করলে এবং আপস মীমাংসায় রাজি না হলে ভারতের বিরুদ্ধে অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে"।
মাওলানা ভাসানী এবং দেশের সচেতন মহল থেকে উদাত্ত আহবান জানানো সত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে কোনো বার্তা না পেয়ে, সারারাত পার হওয়ার পরই ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ফারাক্কা কবলিত উত্তরবঙ্গ সফর শেষে ১৮ এপ্রিল ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে এক জনসভায় ফারাক্কা অভিমুখী লং মার্চের ঘোষণা দেন। সমাবেশে তিনি বলেন গঙ্গা আন্তর্জাতিক নদী। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ভারত এককভাবে এই নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে না। তাই তিনি ১৯৭৪ সালের মুজিব -ইন্দিরা চুক্তির তারিখ ১৬ই মে ফারাক্কা লং মার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
একই দিনে মিসেস গান্ধীর নিকট প্রেরিত এক খোলা চিঠিতে বলেন "দুর্ভাগ্যবশত এই অনুরোধ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও তার সরকারের কাছে গৃহীত না হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মরক্কো কর্তৃক অনুসৃত সাহারা নীতির ন্যায় আমি আগামী ১৬ ই মে রাজশাহী থেকে লক্ষ লক্ষ বুভুক্ষু মানুষ সহ ফারাক্কার দিকে অগ্রসর হইবো..."।
ইন্দিরা গান্ধীর চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন ৪ মে। চিঠিতে তিনি ব্যথিত এবং বিস্মিত হয়েছেন তাই জানিয়েছিলেন। মিসেস গান্ধী চিঠিতে আরো জানান "আপনি নিশ্চয়ই অবহিত আছেন যে ১৫৬ কোটি রুপি ব্যয়ে যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মিত হয়েছে পূর্ব ভারতের প্রাণকেন্দ্র কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর একমাত্র মাধ্যম সেই বাঁধ পরিত্যাগ করা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়।"
মিসেস গান্ধী আরো বলেন আমি আপনাকে বিশ্বাস দিয়ে বলতে চাই" যে কোন যুক্তিসঙ্গত আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে। কিন্তু কারো এ কথা মনে করা উচিত, ভারত কোন হুমকি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না"।
চিঠির শেষে শ্রদ্ধাসহ আপনার একান্ত ইন্দিরা গান্ধী হিসেবে লিখলেও প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে মাওলানা ভাসানীর অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল। বিশেষ করে শেষ বাক্যে দেওয়া হয়েছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি।
জবাবে মাওলানা ভাসানী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আবারো পত্র দিয়েছিলেন। পত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান, উত্তরবঙ্গের ফারাক্কা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখার আহ্বান জানান।।
ফারাক্কা মিছিল সম্পর্কিত ভাসানীর কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পর সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও ভারতপন্থী কয়েকটি দল ছাড়া সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ভাসানীর নেতৃত্বে। লং মার্চ সফল করার জন্য প্রথমে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি হলেও পরে ৭২ সদস্য বৈশিষ্ট্য কমিটিতে রূপান্তরিত করা হয়। ফারাক্কা লং মার্চ পরিচালনার জন্য এবং সফল করার জন্য মাওলানা ভাসানী ১১মে ঢাকার পিজি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের মতামতকে উপেক্ষা করে রাজশাহী যান। তিনি রাজশাহীর সীমান্তবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন এবং জনগণকে আহ্বান জানান লংমার্চে অংশগ্রহণ করতে।
দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে মধ্যে চেতনা ও উদ্দীপনার জোয়ার সৃষ্টি হয়। ১৬ই মে ১০.৩০টায় শুরু হয় লং মার্চের অভিযাত্রা। রাজশাহী ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সারা রাজশাহী শহর ছিল লোকে লোকারণ্য। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া হতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয় রাজশাহী শহরে। রাজশাহী শহরে আগের দিন থেকেই আসতে শুরু করে। রাতে মাদ্রাসা ময়দানে, নগরীর বিভিন্ন স্কুল কলেজগুলোতে অবস্থান নেন। সকাল হতেই জনস্রোত এগিয়ে যেতে থাকে মাদ্রাসার ময়দানের দিকে। "মরণবাধ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও, ফারাক্কার লং মার্চ সফল কর, সফল করো"এসব শ্লোগানে মুখরিত হতে থাকে চারিদিক।
এছাড়া স্লোগান সম্মানিত ব্যানার, ফেস্টুন মিছিল কারীদের হাতে শোভা পাচ্ছিল। সাথে গণসংগীত বাজছিলো। মঞ্চ থেকে ফারাক্কা সংগ্রাম পরিষদের নেতা মশিউর রহমান জাদু মিয়া, কাজী জাফর আহমেদ, আজাদ সুলতান প্রমুখ বারবার মাইকের সামনে এসে জনগণকে ধৈর্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার আহ্বান জানান।
ঐদিন রাজশাহী শহর রূপ নেয় আধিপত্যবাদী ভারতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও প্রতিবাদের কেন্দ্র ভূমিতে। মাওলানা ভাসানী সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে এসে উপস্থিত হওয়ার পর জনাব মশিউর রহমান যাদু মিয়া লংমার্সের প্রস্তাব পাঠ করেন। এরপর মাওলানা বক্তৃতা দিতে উঠে প্রথমে কয়েকটি স্লোগান উচ্চারণ করেন। এসময় মাওলানা ডান হাত কাঁপছিল। ৯২ বছর বয়সী মাওলানা মাত্র ১০ মিনিটের বক্তৃতা প্রদান করেন এবং সভায় গৃহীত প্রস্তাব পাস হওয়ার পর সকাল সাড়ে ১০টায় মিছিলের অগ্রভাগে এসে তিনি দাঁড়ান। মাদ্রাসা মাঠ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকে মিছিল। মিছিল দেখার জন্য রাস্তার দুই ধারে প্রতিটি বাড়ি মেয়ে, বৃদ্ধ শিশুরা বাইরে বেরিয়ে এসে মিছিলকে শুভেচ্ছা জানাতে। পানি, চিড়া, মুড়ি, বিভিন্ন ধরনের ফল, রুটি খাবার দিয়ে মিসেল কারীদের পাশে স্থানীয় বাসিন্দারা। দেখা যায় চার মাইল দীর্ঘ মিছিলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের যাত্রার পর রাজশাহীর শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। মহানন্দা নদীতে শত শত নৌকা দিয়ে বানানো হয় ভাসমান সেতু।
রাজশাহী থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে রাত্রি যাপনের পর ১৭ই মে সকালে ভাষণের নেতৃত্বে মিছিল পুনরায় যাত্রা শুরু করে। রাজশাহী থেকে তিন গুণ লোকের সমাগম হয় এই মিছিলে। এটা পরিণত হয় এক চলমান জনসমুদ্রে।
প্রবল ঝড় বৃষ্টির উপেক্ষা করে আটটায় সীমান্ত থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে কানসাট স্কুল ময়দানে উপস্থিত হন মাওলানা ভাসানী। ঘোষণা দেন বাংলাদেশের পানির ন্যায্য দাবি মেনে ফারাক্কা সমস্যা সমাধানের জন্য।
কনসার্ট হাই স্কুল ময়দানে মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণার আগে মাওলানা ভাসানী বলেছিলেন "গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায় সংগত দাবী মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলনের এখানেই শেষ নয়"।
তিনি আরো বলেন ভারত সরকারের জানা উচিত আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় পায় না, কারো হুমকিকে পরোয়া করে না, যেকোন হামলা থেকে মাতৃভূমিতে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য এবং অধিকার "।
এই মিছিলের জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রচারণার ফলেই ভারতকে বহুদিন পর আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। জনগণের ঐক্য তৎকালীন শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সাহসী করেছিল। তিনি ১৯৭৬ সালেই জাতিসংঘের ৩১ তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ফারাক্কা ইস্যু উপস্থাপিত করেছিলেন। সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক কমিটির ২৪ নভেম্বরের সর্বসম্মত ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছিল।
এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল" ফারাক্কা চুক্তি"। এই স্বীকৃতি ছিল মাওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলের প্রত্যক্ষ অবদান। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ৩৪ হাজার কিউসেক পানি প্রাপ্তি এবং ফারাক্কা পয়েন্টে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে সরবরাহের একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল।
লেখক: প্রফেসর ড. জি. এম. শাফিউর রহমান, আহবায়ক, মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।