

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৫ সালে ভারতে সেচসহ বিভিন্ন কাজের জন্য গঙ্গা নদী থেকে পানি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মিত হয়। পরের বছর ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর নেতৃত্বে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক লংমার্চ। রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠ থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গিয়ে শেষ হয় সেই কর্মসূচি।
লংমার্চের সময় মওলানা ভাসানী আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে বাংলাদেশের নদীতে চর জেগে উঠবে, পানিপ্রবাহ কমে যাবে এবং একসময় দেশ মরুকরণের ঝুঁকিতে পড়বে। পাঁচ দশক পর স্থানীয়দের মতে, সেই আশঙ্কার বাস্তব প্রতিফলন এখন স্পষ্ট। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা, মহানন্দা, পাগলা ও পূনর্ভবা নদী এখন শুষ্ক মৌসুমে পৌঁছেছে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায়। কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল। বিস্তীর্ণ এলাকায় জেগে উঠেছে চর এবং কৃষি, জীববৈচিত্র ও নদীকেন্দ্রিক জনজীবন হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদনেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া প্রবল জলধারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নদী হয়েছে। আজ তা এক রুগ্ন স্মৃতি। একসময়ের খরস্রোতা পদ্মা এখন ধুঁকছে। এর প্রধান কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ। অর্ধশতকে এ বাঁধের প্রভাবে পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ। এতে করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাসীর পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এখন অনেকটাই ভারতের পানি ছাড়ার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। আবার বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিলে দেখা দেয় বন্যা ও তীব্র নদীভাঙন।
শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর চর এলাকার বাসিন্দা আনারুল ইসলাম বলেন, আগে পদ্মায় সারা বছর পানি থাকত। এখন শুষ্ক মৌসুমে হাঁটিয়ে নদী পার হওয়া যায়। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ নেই, কাজও নেই। জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।
একই এলাকার সামিউল আলম বলেন, নদী ভাঙে আবার শুকিয়েও যায়। একদিকে জমি হারাই, অন্যদিকে পানির অভাবে ফসলও ঠিকমতো হয় না।
চরাঞ্চলের জেলে রফিকুল ইসলাম জানান, একসময় পদ্মা থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীতে পানি না থাকায় মাছও নেই। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাদিকুল ইসলাম বলেন, মওলানা ভাসানী যে উদ্দেশ্যে ফারাক্কার বিরুদ্ধে লংমার্চ করেছিলেন তা আজও সমাধান হয়নি। আমরা চাই নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হোক।
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক লুৎফুন নাহার লিনা বলেন, নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, ফারাক্কা ব্যারেজের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে জেলার নদীগুলোর নাব্যতা কমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে যে পরিমাণ পানি পাওয়া যায়, তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও পানি সংরক্ষণে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।