

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


টানা প্রায় ৪০ দিনের সংঘাতের পর অস্থায়ী ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে শান্তসংলাপের জন্য পাকিস্তানে আসার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
তিনি আগামী ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সামনে আসার পর মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে শেহবাজ শরিফ এই আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বলেন, চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পাকিস্তান আলোচনার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও সহায়ক পরিবেশ দিতে প্রস্তুত।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল তিন পক্ষই অন্তত ১৫ দিনের জন্য সামরিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, এই সাময়িক বিরতি যদি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উভয় পক্ষের নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, উত্তেজনা প্রশমনে তারা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন।
শেহবাজ শরিফ তার বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানান, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের ইসলামাবাদে এসে আনুষ্ঠানিক সংলাপে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তার ভাষায়, বিরোধ নিষ্পত্তি, উত্তেজনা কমানো এবং একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য এখনই আলোচনার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, “ইসলামাবাদ সংলাপ” যদি বাস্তবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতিতে একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে
যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেওয়ার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের নেতৃত্বেরই প্রশংসা করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষই এই পর্যায়ে এসে সহনশীলতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।
তার মতে, সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরা এখন শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক উত্তপ্ত। প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন সময় এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি, কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। পরবর্তীতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে -এমন তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হয়।
এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান একটি মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। পরে মিসর ও তুরস্কও কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে একটি ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল, যা মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হয়। তবে সে সময় তেহরান ওই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
পরবর্তীতে ৪ এপ্রিল আবারও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় নতুন একটি প্রস্তাব পাঠানো হয় বলে জানা যায়। সেই প্রস্তাবে দুই ধাপের একটি যুদ্ধবিরতি কাঠামো ছিল।
প্রস্তাবের প্রথম ধাপে বলা হয়, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতিতে যাবে। এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক নানা বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে স্থায়ী সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করা হবে।
তবে সর্বশেষ পরিস্থিতিতে জানা যায়, পূর্ণ ৪৫ দিনের বদলে প্রথম ধাপে ১৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতিতে তিন পক্ষের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দিনের জন্য সামরিক বিরতি দিতে প্রস্তুত। এরপর ইরানও এই প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি জানায় বলে একাধিক সূত্রে আলোচনা ওঠে। একই দিনে ইসরায়েলও এই বিরতিতে সমর্থন দেয় বলে জানা যায়।
এই সমঝোতার পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সরকারি পর্যায়ের সংলাপের জন্য ইসলামাবাদে আসার আমন্ত্রণ জানান। তার মতে, যুদ্ধবিরতির সময়টুকু যদি কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের বড় ধরনের সংঘাত ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।
শেহবাজ শরিফ তার বিবৃতিতে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল যুদ্ধ থামানোর নয়, বরং স্থায়ী রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ভিত্তি তৈরির একটি বিরল সুযোগ। তিনি মনে করেন, এখন যদি সংলাপ ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে উত্তেজনা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান সবসময় আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তাই ইসলামাবাদ এই আলোচনায় কেবল আয়োজকের ভূমিকায় নয়, বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য সেতুবন্ধনকারী রাষ্ট্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে চায়।
মন্তব্য করুন
