বুধবার
০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ট্রাম্পের

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
expand
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরানকে ঘিরে টানা সামরিক উত্তেজনার মধ্যে এবার দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক হামলা ও বোমাবর্ষণ আপাতত স্থগিত রাখা হবে।

বুধবার (৮ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তা আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বিরতি হবে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতির অংশ। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এটি কোনো নিঃশর্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

ট্রাম্প বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে, সম্পূর্ণভাবে এবং নিরাপদভাবে খুলে দিতে হবে। তার দাবি, এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে স্বাভাবিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা না হলে যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাব কার্যকর থাকবে না।

তিনি বলেন, আমি ইরানের বিরুদ্ধে বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছি। তবে তা নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও নিরাপদভাবে খুলে দেওয়ার ওপর।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক বার্তা দুটো পথই একসঙ্গে খোলা রাখতে চাইছে।

ট্রাম্প তার পোস্টে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই ইরানকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যও ছাড়িয়ে গেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তার ভাষায়, আমরা ইতোমধ্যে আমাদের সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছি, এবং অনেক ক্ষেত্রে তা অতিক্রমও করেছি।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তির পথেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

একই পোস্টে ট্রাম্প জানান, ইরানের পক্ষ থেকে একটি ১০ দফা প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যা দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুদিনের বেশ কিছু বিরোধপূর্ণ ইস্যুতেও ইতোমধ্যে আংশিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। তার মতে, এই দুই সপ্তাহের সময়সীমা যদি বজায় থাকে, তাহলে একটি চূড়ান্ত ও কার্যকর চুক্তির পথ আরও সুগম হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত আপাতত পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতের বদলে একটি কৌশলগত বিরতি নিতে চাইছে।

ট্রাম্পের এ ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইরানকে ঘিরে তার বেঁধে দেওয়া চূড়ান্ত সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র এক ঘণ্টা বাকি ছিল। ফলে এই ঘোষণাকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প বারবার ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন যে, যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমঝোতা না হয়, তাহলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে।

সে প্রেক্ষাপটে শেষ মুহূর্তে যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

ট্রাম্প তার পোস্টে আরও জানান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তার দাবি, আঞ্চলিক শান্তি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সামনে এগিয়ে নিতে ইসলামাবাদ থেকে তাকে সরাসরি এ আহ্বান জানানো হয়।

এই প্রসঙ্গে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানও এখন মধ্যস্থতাকারী ভূমিকায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।

এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আরও দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে শাহবাজ শরিফ লিখেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আশাব্যঞ্জক।

তিনি বলেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সফল হওয়ার সুযোগ দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি, যেন তিনি সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়ান।

শাহবাজ আরও বলেন, এই সময়ের মধ্যে যদি সব পক্ষ সংযম দেখায়, তাহলে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইরানের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখে। তার মতে, এটি শুধু আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতেই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সব পক্ষের উচিত অন্তত আগামী দুই সপ্তাহ সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা।

শাহবাজের মতে, এই বিরতি সফল হলে তা ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতকে এক নতুন কূটনৈতিক মোড়ে নিয়ে এসেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের অবস্থান, হরমুজ প্রণালি খোলার বাস্তবতা, এবং দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।

যুদ্ধের ভাষা থেকে আপাতত আলোচনার টেবিলে ফেরার এই ইঙ্গিত স্বস্তির বার্তা দিলেও, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না। বরং আগামী দুই সপ্তাহই নির্ধারণ করে দিতে পারে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে এগোবে, নাকি আবারও বড় সংঘাতের দিকে ফিরে যাবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন