

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দিয়েগো ম্যারাডোনা ও ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নেপলস- ফুটবল ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য এবং আবেগঘন উপাখ্যান। ১৯৮৪ সালের ৫ই জুলাই যখন ম্যারাডোনা স্পেনের বার্সেলোনা ছেড়ে তৎকালীন অনুজ্জ্বল ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন, তখন স্তাদিও সান পাওলোতে ৭০ হাজার মানুষের উল্লাসকে সংবাদমাধ্যম ‘হিস্টেরিয়া’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
ম্যারাডোনা আসার আগে নেপলসের পরিচয় ছিল কেবলই মাদক, মাফিয়া, দারিদ্র্য আর অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে। বিত্তবান উত্তরের ইতালীয়রা দক্ষিণের ন্যাপলিটনদের সবসময় খাটো করে দেখত। ম্যারাডোনা এই অবহেলিত, শোষিত মানুষের মাঝে নিজের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন, কারণ তার শৈশবও কেটেছিল বুয়েনস এইরেসের চরম দারিদ্র্যের মধ্যে।
এমনকি শেষ মুহূর্তে বার্সেলোনা প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত ৫ লাখ পাউন্ড দাবি করলে, নেপলসের কুখ্যাত বস্তির দরিদ্র মানুষ রাস্তায় নেমে ম্যারাডোনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিল।
নাপোলির স্পোর্টিং ডিরেক্টর অ্যান্তোনিও জুলিয়ানো ম্যারাডোনাকে বলেছিলেন, "এখানে এলে তুমি হবে জীবন্ত ঈশ্বর।" কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়েছিল। ম্যারাডোনার জাদুতে ক্লাবটি 'ওয়ান ম্যান টিম' হিসেবে ৭০ বছরের খরা কাটিয়ে ১৯৮৬-৮৭ এবং ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে ইতালিয়ান লিগ (স্কুডেট্টো) ও ইউরোপিয়ান ট্রফি জেতে। ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন তাদের ‘মেসিয়াহ’ বা মুক্তিদাতা। ন্যাপলসের দেওয়ালে, ১০ নম্বর জার্সিতে আর মানুষের মনে তিনি স্থান পান পোপ বা সাধুর মতো।
তবে এই ঈশ্বরের পতনও শুরু হয়েছিল এই শহরেই। ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নেপলসের মাটিতেই মুখোমুখি হয় ইতালি ও আর্জেন্টিনা। ইতালির উত্তর-দক্ষিণের বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে ম্যারাডোনা স্থানীয় ন্যাপলিটনদের সমর্থন আর্জেন্টিনার পক্ষে টেনে নেন।
ম্যাচে ইতালির বিদায়ের পর দেশটির মিডিয়া ম্যারাডোনাকে ‘ডেভিল’ বা শয়তান হিসেবে চিত্রিত করে এবং এক জরিপে তিনি দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হন।
এরপরই তার জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের উপস্থিতি পাওয়ায় ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা এবং মাফিয়া সিন্ডিকেট ‘ক্যামোরা’র সাথে মাদক পাচারের তদন্তের মুখে পড়েন তিনি (যদিও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি)। ১৯৯১ সালে আক্ষেপ নিয়ে ম্যারাডোনা ইতালি ছাড়েন এই বলে, "উত্তরের দলগুলোকে হারিয়ে দেওয়ায় প্রচলিত সমাজ আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।"
২০২০ সালের নভেম্বরে ম্যারাডোনা প্রয়াত হলে বুয়েনস এইরেসের পাশাপাশি নেপলসেও প্রশাসনিক শোক নেমে আসে। ২০২৩ সালে দীর্ঘ ৩৩ বছর পর নাপোলি যখন আবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন গোটা শহর এই জয় উৎসর্গ করে তাদের প্রিয় ডিয়েগোকে। ম্যারাডোনা ও নেপলস একে অপরকে আজীবন ভালোবেসেছে- যে বন্ধন চিরকাল প্রাসঙ্গিক ও অবিচ্ছেদ্য থাকবে।
