


দাঁত ব্রাশ করা দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ। কিন্তু যে টুথপেস্ট দিয়ে মুখের যত্ন নিচ্ছেন, সেটির মাধ্যমেই শরীরে পৌঁছে যাচ্ছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। সম্প্রতি এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায়।
গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। শিশুদের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় অল্প পরিমাণ পেস্ট অনিচ্ছাকৃতভাবে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এমনটি ঘটলে তা সেটি হতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বিশ্বজুড়েই এখন গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, যকৃত, কিডনি, এমনকি প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। যদিও এগুলো ঠিক কতটা ক্ষতি করে, সে বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবে সম্ভাব্য কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। এগুলো বড় প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হতে পারে, আবার প্রসাধনী, ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য, পোশাকের সিনথেটিক তন্তু বা শিল্পকারখানার বিভিন্ন উপাদান থেকেও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে প্রতিদিনই অজান্তে কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এখন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য থেকেও এর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি রয়েছে।
কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে
মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত তিনটি উপায়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
টুথপেস্টের ক্ষেত্রে দাঁত ব্রাশ করার সময় খুব অল্প পরিমাণ পেস্ট গিলে ফেললে মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিপাকতন্ত্রে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের শরীরের নানা অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, কিডনি, মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্রের টিস্যু, প্লাসেন্টা ও পুরুষের প্রজনন অঙ্গ।
এতে বোঝা যায়, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু পরিপাকতন্ত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শরীরের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছাতে পারে।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আবার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ আবার বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের রক্তনালিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ছিল, তাদের হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা অন্যান্য হৃদ্সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কারণ নাকি কেবল একটি সম্পর্ক, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা দরকার।
মস্তিষ্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
সাম্প্রতিক গবেষণায় মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করছেন, খুব ছোট আকারের কিছু প্লাস্টিক কণা রক্ত ও মস্তিষ্কের সুরক্ষাব্যবস্থা অতিক্রম করতে পারে। তবে এগুলো স্মৃতিশক্তি বা স্নায়ুতন্ত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব
অনেক প্লাস্টিকে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান থাকে, যেগুলো হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। গবেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এসব উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে বিপাকক্রিয়া, প্রজননস্বাস্থ্য এবং শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণে প্রভাব পড়তে পারে।
কোষের ক্ষতি
গবেষণাগারে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে কোষ ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। তবে মানুষের শরীরে বাস্তবে এর প্রভাব কতটা, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
ফুসফুসের সমস্যা
বাতাসের মাধ্যমে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক ফুসফুসে জমতে পারে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের কণার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রে প্রদাহ বা অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এই সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও তথ্য প্রয়োজন।
সব গবেষণাই কি একই কথা বলছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও এগুলো কতটা ক্ষতিকর এবং কোন মাত্রায় ক্ষতি শুরু হয়, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগোলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। বিবিসি ফিউচারেও বলা হয়েছে, মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ঝুঁকি কমাতে কী করা যায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা বর্তমানে সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। তবে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা এখনও মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তাই নতুন গবেষণার ফলাফল, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সূত্র: বিবিসি, স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন