শুক্রবার
১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপ ফুটবল: কার লাভ, কার ক্ষতি

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত।
expand
ছবি : সংগৃহীত।

এবারের বিশ্বকাপ আগের যেকোনো আসরের তুলনায় আরও বড়। অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বেড়েছে, ম্যাচও হয়েছে বেশি। ফলে মাঠের খেলার প্রতি দর্শকদের আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অর্থ আয়ের সুযোগও।

মাঠে বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা ইতিহাস গড়লেও মাঠের বাইরের অর্থনৈতিক লড়াইয়ে ঘুরছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। তবে এই বিপুল অর্থপ্রবাহে সবাই সমানভাবে লাভবান হয়নি। কেউ হয়েছেন বড় বিজয়ী, আবার কেউ গুনেছেন লোকসান।

সবচেয়ে বড় বিজয়ী ফিফা

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জন্য বিশ্বকাপ আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটি রেকর্ড ৭.৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) আয় করেছিল। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ থেকে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

ডয়েচে ব্যাংক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যারিয়ন লাবুরে বলেন, চার বছরের আর্থিক চক্র শেষে ফিফার মোট আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। তার ভাষায়, "নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় আর্থিক বিজয়ী ফিফা।"

ফিফার আয়ের উৎসের মধ্যে রয়েছে সম্প্রচার স্বত্ব, লাইসেন্স, আতিথেয়তা সেবা, স্পন্সরশিপ চুক্তি এবং টিকিট বিক্রি।

এছাড়া ফিফা এবার নিজেদের অফিসিয়াল পুনর্বিক্রয় (রিসেল) প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে ফিফা আরও বেশি আয়ের লক্ষ্যে বিশ্বকাপকে ৬৪ দলে উন্নীত করার কথাও ভাবছে। এতে চীন ও ভারতের মতো বড় বাজার যুক্ত হলে দর্শকসংখ্যা এবং আয়—দুটিই আরও বাড়বে।

অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত সমর্থকরা

বিশ্বকাপ দেখা অনেক সমর্থকের আজীবনের স্বপ্ন পূরণ করলেও আর্থিকভাবে তাদের জন্য এটি ছিল ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা।

টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম এবং চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ানোর ফিফার ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নীতির ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেন, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের সম্ভাব্য এক হাজার ডলারের টিকিট তিনি কিনতেন না।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের অফিসিয়াল টিকিটের দাম ছিল ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার। পুনর্বিক্রয় বাজারে কিছু টিকিটের মূল্য ২০ লাখ ডলারেরও বেশি ওঠে।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় ক্রীড়া আসরের তুলনায় এই মূল্য অস্বাভাবিক নয়।

টিকিটের পাশাপাশি বিমানভাড়া, হোটেল, খাবার ও স্থানীয় পরিবহন খরচও সমর্থকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

উদাহরণ হিসেবে নিউ জার্সি ট্রানজিটের ট্রেনভাড়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। সাধারণ সময়ে ৩০ মিনিটের যাতায়াতের রিটার্ন ভাড়া যেখানে ছিল ১২.৯০ ডলার, বিশ্বকাপ চলাকালে সেটি বাড়িয়ে ১৫০ ডলার করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে কিছুটা কমানো হলেও স্বাভাবিক দামের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

লাভের মুখে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সর

বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো বিজ্ঞাপন বিক্রি করে বড় অঙ্কের আয় করছে।

এবার খেলোয়াড়দের জন্য ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ চালু করে ফিফা। ইনফান্তিনো দাবি করেন, এটি সম্পূর্ণ ক্রীড়াগত সিদ্ধান্ত এবং এর মাধ্যমে ফিফা অতিরিক্ত কোনো আয় করছে না।

তবে এই ৯০ সেকেন্ডের বিরতি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরদের জন্য নতুন বিজ্ঞাপনী সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে বিজ্ঞাপন বিরতির সঙ্গে খেলা সম্প্রচার অনেকটাই পরিচিত বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারকারী ফক্স স্পোর্টস, যারা সম্প্রচার স্বত্বের জন্য প্রায় ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, তারা এই বিরতিগুলো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপে প্রচার করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফক্সে ৩০ সেকেন্ডের একটি বিশ্বকাপ বিজ্ঞাপনের মূল্য গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচগুলোতে শেষদিকে এর দাম বেড়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হাইড্রেশন ব্রেকের বিজ্ঞাপন থেকে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে অবশ্য বিবিসি ও আইটিভিতে সম্প্রচার দেখার সময় দর্শকরা এই বিজ্ঞাপন দেখেননি। কারণ বিবিসিতে বিজ্ঞাপন নেই এবং আইটিভি বিজ্ঞাপনের সময়সীমা সংক্রান্ত কঠোর নিয়ম মেনে চলে।

অফিসিয়াল স্পন্সর অ্যাডিডাস ও কোকা-কোলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্বকাপের মাধ্যমে বিপুল প্রচারণা পেয়েছে। অ্যাডিডাস তাদের ‘ব্যাকইয়ার্ড লেজেন্ডস’ বিজ্ঞাপনে লামিনে ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম ও লিওনেল মেসিকে নিয়ে প্রায় ৫ কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছে।

তবে কিছু অনানুষ্ঠানিক ব্র্যান্ডও আলোচনায় এসেছে। যেমন, সান ফ্রান্সিসকোর লেভাইস স্টেডিয়ামের বাইরের ‘Levi's’ লোগো ঢেকে দেওয়ায় সেই ব্র্যান্ডও অতিরিক্ত প্রচার পায়।

ডেভিড বেকহ্যাম: বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রতীক

অ্যাডিডাসের প্রধান বিজ্ঞাপনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি স্যার ডেভিড বেকহ্যামের সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে।

খেলা ছাড়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরও বেকহ্যাম যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের অন্যতম বড় মুখ। হোম ডিপো থেকে শুরু করে ব্যাংক অব আমেরিকা—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে তার উপস্থিতি নিয়মিত।

তিনি সহ-মালিকানাধীন ইন্টার মায়ামি বর্তমানে মেজর লিগ সকারের সবচেয়ে মূল্যবান ক্লাব, যার বাজারমূল্য প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বকাপ ট্রফি না জিতলেও বাণিজ্যিক দিক থেকে বেকহ্যামকে বড় বিজয়ী বলেই মনে করা হয়।

আয়োজক শহরগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী লাভ হয়নি

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি আয়োজক শহরে পর্যটক ও সমর্থকদের ভিড়ে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসা কিছুটা লাভবান হয়েছে।

ফিফার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার এবং শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ১৭ বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজান্ডার বাডজিয়ার মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এমন বড় ক্রীড়া আয়োজন থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল খুব কমই পাওয়া যায়।

তার মতে, অনেক পর্যটক বিশ্বকাপের ভিড় এড়াতে অন্য সময় ভ্রমণ করেন। আর যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, তার বেশিরভাগই স্বল্প বেতনের আতিথেয়তা খাতের চাকরি।

তার ভাষায়, "এতে চাকরি সৃষ্টি হয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সম্পদ সৃষ্টি হয় না।"

তিনি মনে করেন, এমন আয়োজনের সবচেয়ে বড় সুফল হতে পারে অবকাঠামো উন্নয়ন। যেমন, ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের পর স্ট্র্যাটফোর্ড এলাকার পুনর্গঠন।

কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে বিদ্যমান স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো ব্যবহার করায় নতুন উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ খুব কম হয়েছে।

হোটেল খাত: প্রত্যাশার চেয়ে কম ব্যবসা

বিশ্বকাপ উপলক্ষে হোটেল বুকিং ব্যাপক বাড়বে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাঙ্কুভারে সাতটি ম্যাচ আয়োজন সত্ত্বেও জুন-জুলাইয়ে বুকিং আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।

তাদের মতে, বিশ্বকাপ টানা ৪০ দিন হোটেল পূর্ণ রাখে না; বরং নির্দিষ্ট ম্যাচের সময় চাহিদা বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল মালিকদের সংগঠনও অভিযোগ করেছে, ফিফা নিজেদের প্রয়োজনে অতিরিক্ত কক্ষ সংরক্ষণ করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করেছে। যদিও ফিফা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ডয়েচে ব্যাংকের ম্যারিয়ন লাবুরে বলেন, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।

তার তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ হোটেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল, তাদের বুকিং পূর্বাভাসের চেয়ে কম। নিউইয়র্কের দুই-তৃতীয়াংশ এবং সিয়াটলের প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেল মালিকও প্রত্যাশার তুলনায় কম ব্যবসার কথা জানিয়েছেন।

সবচেয়ে বড় আর্থিক লাভ বেটিং কোম্পানিগুলোর

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুয়া বা ক্রীড়া বাজির আসরে পরিণত হয়েছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারির হিসাবে, বিশ্বকাপজুড়ে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরা হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলার।

৪৮ দলের সম্প্রসারিত আসরে ম্যাচসংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০০-এর বেশি হওয়াই এর প্রধান কারণ।

প্যাডি পাওয়ার, বেটফেয়ার ও স্কাই বেটের মালিক ফ্লাটার এন্টারটেইনমেন্টও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে বাজার সম্প্রসারণের কারণে আগের বিশ্বকাপের তুলনায় বাজির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।

ম্যাককোয়ারির বিশ্লেষক চ্যাড বেইনন বলেন, এখন ম্যাচ শুরুর আগে বাজি ধরার চেয়ে চলমান ম্যাচে পরিস্থিতি দেখে তাৎক্ষণিক বাজি ধরার প্রবণতা অনেক বেড়েছে।

২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে নেভাডা অঙ্গরাজ্য ছাড়া অন্য কোথাও ক্রীড়া বাজি বৈধ ছিল না। তবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর অনেক অঙ্গরাজ্যে এটি বৈধতা পেয়েছে।

যদিও ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের মতো কিছু অঙ্গরাজ্যে এখনো ক্রীড়া বাজি অবৈধ। সেখানে তরুণদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘প্রেডিকশন মার্কেট’, যা আইনগতভাবে জুয়া হিসেবে বিবেচিত না হওয়ায় খেলাধুলা নিয়েও সেখানে অর্থের বিনিময়ে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS England
Scheduled
19 Jul, 03:00 AM
VS
World Cup