

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


√ মাত্র ৬০০ টাকার দুইটি সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়েই হত্যা
√ টানা এক মাস ধরে চলে হত্যার পরিকল্পনা ও নজরদারি
√ লাইভ লোকেশন পাওয়ার পর ওত পেতে ছিলেন মাহির ও আয়লান
√ রক্তাক্ত জোবায়েদকে দেখে বর্ষার মন্তব্য-‘তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত’
‘কখন মারবা!’-জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি মো. জোবায়েদ হোসাইনকে হত্যার দিন দুপুরে অভিযুক্ত মাহির রহমানকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন বার্জিস শাবনাম বর্ষা।
শুধু ঘটনার দিনই নয়, এর আগের প্রায় এক মাস ধরে তিনি মাহিরকে জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ধরা পড়লেও বিষয়টি আইনগতভাবে সামাল দেওয়া যাবে বলে আশ্বস্ত করা, কোথায় হত্যা করলে সুবিধা হবে সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং ঘটনার দিন জোবায়েদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সরবরাহের অভিযোগও উঠে এসেছে।
এসব তথ্য উঠে এসেছে জোবায়েদ হত্যা মামলায় পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রে সংযুক্ত আসামি মাহির রহমানের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে।
প্রায় নয় মাসের তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন।
অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হয়েছে বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯), তাঁর প্রেমিক মাহির রহমান (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১)। তদন্তে পুলিশের অভিযোগ, মাহির ছিলেন মূল হামলাকারী, বর্ষা পরিকল্পনায় জড়িত এবং আয়লান সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন।
অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আলামত সংযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে পরিকল্পনা শুরু হয়। এরপর প্রায় এক মাস ধরে জোবায়েদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ঘটনাস্থল রেকি, অস্ত্র সংগ্রহ এবং হামলার প্রস্তুতি চলে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যার কয়েক দিন আগে মাহির ও আয়লান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন এবং দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি সংগ্রহ করেন। মাহির তাঁর জবানবন্দিতে দাবি করেছেন, ছুরি কিনতে মোট ৬০০ টাকা খরচ হয়েছিল, যার মধ্যে ৫০০ টাকা বর্ষা বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে যাওয়া-আসার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সেই তথ্য পাওয়ার পরই ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান। ফরেনসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জোবায়েদের গলার গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রে মাহিরের ডিএনএও পাওয়া গেছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
মাহিরের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, বর্ষা তাঁকে প্রায় প্রতিদিনই জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন। ধরা পড়লে কী হবে জানতে চাইলে বর্ষা নাকি বলেছিলেন, তাঁদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন এবং বিষয়টি সামাল দেওয়া যাবে। জবানবন্দিতে মাহির আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন দুপুরে বর্ষা তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কখন মারবা!’
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হত্যার আগের রাত পর্যন্ত বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে স্বাভাবিক কথোপকথন চলছিল। ঘটনার দিনও জোবায়েদ গৃহশিক্ষক হিসেবে বর্ষাকে পড়াতে ওই বাসায় যান। তদন্ত কর্মকর্তার মতে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যোগাযোগ স্বাভাবিক থাকায় জোবায়েদ হত্যার পরিকল্পনার কোনো আভাস পাননি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জোবায়েদ কোনোভাবে ভবনের ওপরের তলায় উঠে বর্ষার কাছে সাহায্য চান। নথিতে উল্লেখ আছে, বর্ষার জবানবন্দি অনুযায়ী তিনি ওই সময় বলেন, ‘তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ তবে এ বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার রৌশান ভিলা ভবনের সিঁড়ি থেকে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ভবনেই তিনি গৃহশিক্ষক হিসেবে বর্ষাকে পড়াতে যেতেন। পরদিন নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্র আদালতে পৌঁছানোর পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে বর্ষার মা দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে নির্দোষ। অন্যদিকে নিহতের পরিবারের প্রত্যাশা, বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।