

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন লিওনেল মেসি। টুর্নামেন্টে নিজের ১৮তম গোল করে নতুন রেকর্ড গড়ার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার গোলসংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যান নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
ভাইরাল হওয়া সেই তথ্যে দাবি করা হচ্ছে, মেসির বিশ্বকাপের ১৮ গোলের মধ্যে ১৬টিই এসেছে এমন দেশগুলোর বিপক্ষে, যারা কখনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সংখ্যার হিসাবে তথ্যটি সঠিক হলেও ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।
বিশ্বকাপের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জিতেছে। দেশগুলো হলো ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, উরুগুয়ে, স্পেন ও ইংল্যান্ড। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা মেসির নিজের দেশের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ নেই। ফলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের তালিকা থেকে একটি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল স্বাভাবিকভাবেই বাদ পড়ে যায়।
বাকি সাত সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মধ্যে বিশ্বকাপে মেসি মুখোমুখি হয়েছেন কেবল ফ্রান্স ও জার্মানির। ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুটি গোল করেন তিনি। অন্যদিকে ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে খেললেও গোলের দেখা পাননি।
ফলে ভাইরাল হওয়া পরিসংখ্যানটি সংখ্যাগতভাবে সঠিক হলেও সেটি প্রেক্ষাপটবিহীন। কারণ মেসির অধিকাংশ গোল এসেছে এমন দলগুলোর বিপক্ষে, যাদের বিপক্ষে খেলাই তার জন্য সম্ভব হয়েছে। অনেক সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগই পাননি তিনি। তাই শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে তার পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না।
খেলোয়াড় পরিসংখ্যান বিশ্লেষক ও ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, ব্রাজিল, উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড ও স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপে মেসি কখনোই মাঠে নামেননি। যে দলের বিপক্ষে খেলারই সুযোগ হয়নি, তাদের বিপক্ষে গোল না থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক। ফলে এই পরিসংখ্যানকে মেসির ব্যর্থতা হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।
অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন যে, বিশ্বকাপে গোল মানেই বড় দলের বিপক্ষে হতে হবে। কিন্তু ফুটবলীয় বাস্তবতায় বিশ্বকাপ না জিতলেও নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া, মেক্সিকো বা পর্তুগালের মতো দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী। এই দলগুলোর বিপক্ষে গোল করাও বিশ্বকাপের মতো চূড়ান্ত মঞ্চে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। শুধুমাত্র 'বিশ্বকাপ জয়ী' দেশের বিপক্ষে গোলের সংখ্যা দিয়ে খেলোয়াড়ের সামর্থ্য বিচার করাকে ফুটবলীয় বাস্তবতার পরিপন্থী হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবার বিশ্বকাপে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে মেসি দুই ম্যাচেই করেছেন ৫ গোল। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করার মাধ্যমে তিনি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের দীর্ঘস্থায়ী রেকর্ড ভেঙে এককভাবে ১৮ গোল নিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের মতো উচ্চচাপের মঞ্চে তার এই গোল করার ক্ষুধা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিস্ময়ের।
তাই পরিসংখ্যান যে সবসময় পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেয় না, মেসির ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি কেবল গোলদাতা নন, বরং নকআউট পর্ব, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে পারফর্ম করে নিজের জাত চিনিয়েছেন। তাই প্রেক্ষাপটহীন এই পরিসংখ্যান কেবল বিভ্রান্তিই ছড়ায়। মাঠের ফুটবল ও অর্জন যখন বড় হয়, তখন ছোটখাটো পরিসংখ্যানের বিতর্ক ফিকে হয়ে যায়—মেসির ক্যারিয়ার এই সত্যেরই প্রতিচ্ছবি।
