বৃহস্পতিবার
১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজারিও থেকে বিশ্বজয়: মেসির অমর মহাকাব্য

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি
expand
লিওনেল আন্দ্রেস মেসি

“Lionel Messi has shaken hands with paradise…”—পিটার ড্রুরির কণ্ঠে উচ্চারিত এই বাক্য যেন এক ইতিহাসের সিলমোহর। সেই মুহূর্তেই ফুটবল বিশ্ব বুঝে নিয়েছিল একটি মহাকাব্য সম্পূর্ণ হলো। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। রোজারিওর এক স্বপ্নবাজ শিশুর গল্প শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে অমর কিংবদন্তিতে।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া মেসির শৈশব ছিল লড়াইয়ের। ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ নামের কঠিন বাস্তবতা তার পথ আটকে দিতে চেয়েছিল বহুবার। কিন্তু প্রতিভা, অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে থামাতে পারেনি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাড়ি জমাতে হয় ইউরোপে স্বপ্ন বাঁচানোর জন্য, নিজেকে গড়ে তোলার জন্য। তবু হৃদয়ের গভীরে রোজারিও রয়ে গেছে তার চিরন্তন ঠিকানা হয়ে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ—মেসির ক্যারিয়ারের পরম পূর্ণতা। ব্যক্তিগত সাফল্য, ক্লাব ফুটবলে আধিপত্য সবই ছিল তার দখলে। কিন্তু বিশ্বকাপ শিরোপা যেন ছিল অপূর্ণতার শেষ রেখা। সেই রেখা মুছে দিয়ে তিনি পৌঁছে যান ফুটবলের চূড়ান্ত উচ্চতায়—যেখানে তুলনা থেমে যায়, শুরু হয় শ্রদ্ধা।

অনেকে ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো ইতি টানবেন তিনি। কিন্তু মেসি মানেই তো সীমা অতিক্রম করা। বয়সের ভার নয়, বরং দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসাই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আরও একবার বিশ্বমঞ্চে—২০২৬ বিশ্বকাপে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মাটিতে হতে পারে তার শেষ নৃত্য, শেষ অধ্যায়।

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপে প্রথম পা রাখা সেই তরুণ মেসি আজ ইতিহাসের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ফুটবল শিল্পীদের একজন। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল ও অ্যাসিস্ট দিয়ে যে যাত্রা শুরু, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মহাকাব্যে। ২০১০-এ প্লে-মেকার, ২০১৪-এ হৃদয়ভাঙা ফাইনাল, ২০১৮-তে সংগ্রামের গল্প আর ২০২২-এ চূড়ান্ত বিজয়।

কাতার বিশ্বকাপে তার প্রতিটি স্পর্শ ছিল শিল্পের মতো। সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের ধাক্কা পেরিয়ে দলকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০০০তম ম্যাচে গোল, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে স্নায়ুচাপের লড়াই, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একক আধিপত্য সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য নায়ক।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ফাইনাল যেখানে সময়, চাপ আর প্রত্যাশার বিরুদ্ধে লড়েছেন তিনি। দুই গোল, অবিচল নেতৃত্ব, আর টাইব্রেকারে দৃঢ়তা সব মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় প্রদর্শনী। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ৪-২ ব্যবধানের জয় শুধু একটি শিরোপা নয়, বরং একটি যুগের স্বীকৃতি।

পরিসংখ্যান তার মহত্ত্বের প্রমাণ দেয়, কিন্তু মেসিকে ব্যাখ্যা করে না। পাঁচটি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ২৬ ম্যাচ, ২৩১৪ মিনিট, ১৩ গোল ও ২১টি গোল-অবদান এসব কেবল সংখ্যা। আসল মেসি লুকিয়ে আছেন তার ছন্দে, তার স্পর্শে, তার দৃষ্টিতে। ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার গোল্ডেন বল জয়—তাও যেন তার গল্পের একটি ছোট অংশ।

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ কেবল একজন ফুটবলার নন তিনি এক অনুভূতি, এক অনুপ্রেরণা, এক চিরন্তন গল্প। মেসি মানে শুধু জেতা নয়, মেসি মানে স্বপ্ন দেখা আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন