


নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনসহ সাহাবায়ে কেরামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ ছিল নিজেদের ইমান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী থাকা। আজ সে সুন্নাহটি আমাদের মধ্য থেকে অনেকখানি হারিয়ে গেছে। আমাদের সমাজে খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই এখন নিজের ইমান নিয়ে চিন্তা করেন, ভাবেন, আত্মসমালোচনা কিংবা আত্মপর্যালোচনা করেন।
এ বিষয়ে মুসনাদে আহমদে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস রয়েছে। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ইমান নবায়ন করো।’ সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন রাখলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কীভাবে আমাদের ইমানকে নবায়ন করতে পারি?’ নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বললেন, ‘তোমরা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলবে।’ অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মাবুদ নেই—এই কথা বলার মধ্য দিয়েই ইমানকে নবায়ন করা সম্ভব।
এই হাদিসটি আমাদের অনেকেরই জানা। কিন্তু হাদিসটি জানার পরও কয়জন মানুষ আছেন, যারা নিজের ইমান নিয়ে খুব বেশি চিন্তা-ভাবনা করার বা আত্মসমালোচনা করার সুযোগ পান? নেক আমল, তাকওয়া বা বিভিন্ন ইবাদত নিয়ে আমরা কমবেশি চিন্তাভাবনা করলেও ইমানের ঠিক কোন পর্যায়ে আমরা আছি, আদৌ আমাদের ইমান মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য কি না, ইমানে কোনো ভেজাল বা ত্রুটি আছে কি না সে বিষয়ে ভাববার ফুরসত আমাদের খুব একটা হয়ে ওঠে না।
বিখ্যাত তাবেঈ ইবনে আবি মুলাইকা বলেছেন, ‘আমি ৩০ জন সাহাবীকে পেয়েছি, যারা প্রত্যেকেই নিজেদের ইমান নিয়ে শঙ্কিত ও দুশ্চিন্তায় থাকতেন।’ আর হাসান বসরী (রহ.) বলেছেন, ‘ইমান নিয়ে যারা দুশ্চিন্তা করেন, ভাবেন যে ইমান থাকলো কি থাকলো না—এ আশঙ্কা যাদের মধ্যে থাকে, তারাই মূলত ইমানদার। আর ইমান সম্পর্কে কেউ যদি একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে, তবে সেটি তার মুনাফিক হওয়ার লক্ষণ।’ আমরা যারা নিজেদেরকে তথাকথিত মুমিন মনে করে নিশ্চিন্ত হয়ে আছি, তাদের জন্য হাসান বসরীর (র.) এই উক্তিতে অনেক বড় বার্তা রয়েছে।
সাহাবায়ে কেরামের ইমানের প্রতি মনোযোগের বিষয়টি কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, একবার আবু বকর সিদ্দীকের (রা.) সাথে হানজালার (রা.) দেখা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন আছো ভাই হানজালা?’ হানজালা (রা.) উত্তর দিলেন, ‘হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে! নবীজির কাছে যখন থাকি, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা শুনি, তখন ইমানের যে অবস্থা অনুভব করি; পরিবার বা দুনিয়াবি কাজে ডুবে গেলে সেই অবস্থা আর থাকে না।’ এই দুশ্চিন্তার কথা শুনে আবু বকর (রা.) বললেন, ‘আমারও তো একই অবস্থা হয়!’
এরপর উভয় সাহাবি রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে গেলেন। নবীজি (সা.) তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি সবসময় একই অবস্থায় থাকতে, তবে ফেরেশতারা এসে তোমাদের সাথে মুসাফাহা করতো। ইমান কখনো বাড়বে, কখনো কমবে, কখনো দুর্বল হবে, কখনো সবল হবে।’ আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এবং হানজালার (রা.) মতো মর্যাদাপূর্ণ সাহাবিরা নিজেদের ইমানের সামান্য তারতম্য নিয়ে কতটা ব্যাকুল ও চিন্তিত থাকতেন, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজের ইমানের ব্যাপারে এতটাই শঙ্কিত ছিলেন যে, তিনি নবীজির গোপন তথ্যের বাহক হুজাইফা ইবনে ইয়ামানকে (রা.) প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতেন, ‘নবীজি তোমাকে যে মুনাফিকদের তালিকা দিয়েছেন, সেখানে কি আমার নাম আছে? একটু দেখো ভাই!’ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি সবসময় আশঙ্কায় থাকতেন, তিনি আল্লাহর কাছে খাঁটি মুমিন হিসেবে নির্বাচিত হতে পারলেন কি না। তিনি সঙ্গীদের ডেকে বলতেন, ‘এসো, আমরা একটু ইমানকে বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করি।’
একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) তাঁর সঙ্গীদের বলতেন, ‘এসো আমাদের সাথে বসো, আমরা একটু ইমানকে বৃদ্ধি করার চেষ্টা করি।’ তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমার ইমান, ইয়াকিন ও দ্বীনের বুঝ বৃদ্ধি করে দিন।’
সাহাবি জুন্দুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, ‘আমরা যখন টগবগে তরুণ, তখন নবীজির (সা.) সাথে ছিলাম। আমরা কোরআন শেখার আগেই ইমান শিখেছি, ফলে আমাদের ইমান বৃদ্ধি পেয়েছে।’ এখান থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিই ছিল ইমান। তাঁদের আদর্শ ছিল, আগে ইমান, তারপর জ্ঞান ও আমল।
সাহাবিরা ফেতনার মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত না থেকেও যদি ইমান নিয়ে এত চিন্তিত থাকেন, তবে বর্তমান যুগে ফেতনায় ডুবে থাকা আমাদের মতো মানুষের ইমান নিয়ে কত বেশি ভাবা উচিত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আজ নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার আল্লাহর স্মরণে কখনো কি আমাদের অন্তর বিগলিত হয়ে চোখে পানি এসেছে? গুনাহর মুহূর্তে আল্লাহর কথা স্মরণ করে তা থেকে কি আমরা ফিরে আসতে পেরেছি? রুকু-সিজদায় আল্লাহর ইবাদতের মূল স্বাদ ও তৃপ্তি কি আমরা পাই? এই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নিজেদের প্রতিনিয়ত জবাবদিহির মুখোমুখি করা প্রয়োজন।
বর্তমান যুগে আমাদের ইমান দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, দুনিয়ার অতিরিক্ত ব্যস্ততা, ধারাবাহিক গুনাহ, মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার, কোরআন থেকে দূরে থাকা, খারাপ সঙ্গ এবং আখেরাত নিয়ে চিন্তাভাবনা না করা।
প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট নিজেকে সময় দিয়ে নিজের ইমানের অবস্থা পর্যালোচনা করা উচিত। ইমান কিসে ভাঙে, কিসে দুর্বল বা সবল হয় তা জানা প্রয়োজন। এরপর পরিবার ও পরিচিতদের নিয়ে ইমানের আলোচনা করা, প্রতিদিন অর্থসহ কোরআন তিলওয়াত করা, আল্লাহর জিকিরে সময় দেওয়া, আত্মপর্যালোচনা করা এবং নির্দিষ্ট কিছু গুনাহ বর্জনের চর্চা করা যেতে পারে।
বস্তুবাদের এই মহাজোয়ারে আমাদের অজান্তেই ভেতরে শিরক বা নেফাক প্রবেশ করছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একই সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, ‘হে আমাদের রব, সরল সঠিক পথ দেখানোর পর আমাদের অন্তরকে আপনি আর বক্র করে দেবেন না।’ মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহাবা ও সালাফদের মতো ইমানের প্রতি মনোযোগী হওয়ার এবং সবল ইমান নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার তওফিক দান করুন।