


ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) এবার মূল্যায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু মুনাফা কিংবা ব্যবসা বাড়ানোর হিসাবেই মূল্যায়ন করা হবে না এমডিদের। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কতটা কমেছে, কত টাকা আদায় হয়েছে, মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি কেমন, সুশাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছে, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্যাংকের অগ্রগতি কতটুকু—এসবের প্রতিটি বিষয়েই দিতে হবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের ভিত্তিতে নম্বর পেয়ে নির্ধারিত হবে এমডি/সিইওর কর্মদক্ষতা।
ব্যাংকের এমডি/সিইওদের জন্য নতুন ‘কি পারফরম্যান্স ইনডিকেটরস ফ্রেমওয়ার্ক (KPIs)’ জারি করে এমন কাঠামো নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি করা এই নির্দেশনায় পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে মোট ১০০ নম্বরের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—ব্যাংকের এমডি/সিইওর কর্মদক্ষতা এখন পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ কমানো, শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায় এবং ব্যাংকের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রভাব পড়বে চূড়ান্ত স্কোরে।
১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০-ই ঋণ ও আর্থিক সক্ষমতায়
নতুন KPI কাঠামোতে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ২৫ শতাংশ রাখা হয়েছে ব্যাংকের সলভেন্সি অ্যান্ড লিকুইডিটি অর্থাৎ মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য। একই ২৫ শতাংশ অ্যাসেট কেয়ালিটি অর্থাৎ ঋণের মান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য। আরও ১০ শতাংশ মুনাফা, ২৫ শতাংশ সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং ১৫ শতাংশ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহক ও বাজার আচরণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে দেখা যাচ্ছে, শুধু মুনাফা করাই এমডি/সিইওর প্রধান সাফল্যের মাপকাঠি থাকছে না। বরং ব্যাংক কতটা নিরাপদ, তার ঋণপোর্টফোলিও কতটা সুস্থ এবং পরিচালনায় কতটা সুশাসন রয়েছে—এসবকে সমান বা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ কমানোয় সরাসরি নজর
অ্যাসেট কেয়ালিটি বা সম্পদের মানের ২৫ নম্বরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৫ শতাংশ ওজন রাখা হয়েছে গ্রস এনপিএল রেশিও-তে। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনার বিষয়টি এমডি/সিইওর মূল্যায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া নেট এনপিএল রেশিও-তে ১০ শতাংশ, stressed assets-এ ১৫ শতাংশ, provision coverage-এ ১৫ শতাংশ, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার ঘনত্বে ১৫ শতাংশ এবং শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে ২০ শতাংশ ওজন রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ থেকে টাকা আদায় করাও এমডিদের অন্যতম প্রধান কর্মদক্ষতার মাপকাঠি হবে।
ছয় সূচকে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত নম্বর কাটা
শুধু কেপিআই (KPI) পূরণ না করলেই বিষয়টি শেষ হচ্ছে না। ছয়টি ‘ক্রিটিক্যাল কেপিআই’-তে নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম অর্জন করলে কিংবা কোনো নম্বর না পেলে এমডি/সিইওর মোট স্কোর থেকে অতিরিক্ত নম্বর কেটে নেওয়া হবে। এই ছয় সূচক হলো— ১. এডিআর বা ঋণ-আমানত অনুপাত ২. গ্রস এনপিএল রেশিও ৩. নেট এনপিএল রেশিও ৪. বড় ঋণ/শীর্ষ ঋণগ্রহীতার ঘনত্ব ৫. শ্রেণিকৃত ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ৬. সিএমএসএমই, কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতা। এসব গুরুত্বপূর্ণ সূচকের যেকোনোটিতে ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে সংশ্লিষ্ট সর্বোচ্চ ওজনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নম্বর কাটা যেতে পারে। ছয়টি সূচকেই ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৮১২৫ নম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত কর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
লক্ষ্য পূরণ ৫০ শতাংশের নিচে হলে শূন্য
প্রতিটি কেপিআই-এর ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জন করতে হবে। এর নিচে হলে ওই সূচকে কোনো নম্বর পাওয়া যাবে না। আর ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অর্জন হলে আনুপাতিক হারে নম্বর দেওয়া হবে। চূড়ান্ত স্কোরে ৭৫ বা তার বেশি হলে ‘অ্যাবোভ অ্যাভারেজ’, ৬৫ থেকে ৭৫-এর নিচে হলে ‘অ্যাভারেজ’ এবং ৬৫-এর নিচে হলে ‘বিলো অ্যাভারেজ’ হিসেবে কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করা হবে।
ছয় মাস পরপর হবে মূল্যায়ন
নতুন কাঠামো অনুযায়ী এমডি/সিইওদের জন্য দায়িত্বের শুরুতেই KPI ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। বিদ্যমান এমডি/সিইওদের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। লক্ষ্য সাধারণত তিন বছর বা সংশ্লিষ্ট এমডি/সিইওর অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্ধারণ করা হবে। তবে তা ছয় মাসের রোলিং টার্গেট হিসেবে পর্যালোচনা করা হবে। বর্তমান এমডি/সিইওদের প্রথম মূল্যায়নকাল ধরা হয়েছে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭।
প্রতি ছয় মাসে পরিচালনা পর্ষদ এমডি/সিইওর কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা করবে এবং সেই প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরবর্তী নির্দেশনা বা ব্যবস্থা নিতে পারবে।
মুনাফার চেয়ে সুশাসনে বেশি গুরুত্ব
নতুন কাঠামোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—মুনাফা অর্জনের চেয়ে Governance and Internal Control-কে আড়াই গুণ বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুনাফায় যেখানে ১০ শতাংশ ওজন, সেখানে সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ২৫ শতাংশ।
এর আওতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পরিপালন, AML/CFT, ব্যাংকের সামগ্রিক ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন, ICT ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে।
গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও নম্বরের আওতায়
এমডি/সিইওদের কর্মদক্ষতার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে Inclusion, Customer and Market Conduct-এর জন্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০ শতাংশ ওজন রাখা হয়েছে সিএমএসএমই (কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প), কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায়।
এ ছাড়া ডিজিটাল সেবা, গ্রাহকসেবার মান, গ্রামীণ ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ঋণ, জালিয়াতি ও প্রতারণা প্রতিরোধ এবং ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনি ঝুঁকি কমানোর বিষয়ও মূল্যায়নে থাকবে।