

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু এই মাছের প্রসঙ্গ কেবল আমাদের অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, মরুভূমির দেশে জন্ম নেওয়া স্বয়ং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খাদ্যতালিকাতেও মাছের উপস্থিতি ছিল।
মক্কা ও মদিনা পাহাড়ে ঘেরা হলেও আরবের চারপাশের বিশাল সমুদ্র থেকে আরবদের খাবারে মাছ যুক্ত হতো। নবীজি (সা.) নিজেও মাছ পছন্দ করতেন এবং খেয়েছেন। হাদিস ও সাহাবিদের জীবনীতে এর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রমাণ হলো ঐতিহাসিক ‘আম্বার মাছ’-এর ঘটনা।
ক্ষুধার্ত সেনাদল ও সাগরের উপহার
হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ বুখারিতে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তারা আবু উবাইদা (রা.)-এর নেতৃত্বে ‘জাইশুল খাবাত’ নামক যুদ্ধে অংশ নিতে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে তিনশত সাহাবির এই সেনাদল চরম খাদ্যসংকটে পড়ে এবং তীব্র ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে।
ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর কুদরতে সমুদ্র তীর ঘেঁষে ভেসে আসে বিশাল এক মৃত মাছ, যাকে ‘আম্বার মাছ’ বলা হয়। সাহাবিরা এত বিশাল আকৃতির কোনো প্রাণী আগে কখনো দেখেননি। ওই মাছের গোশত খেয়ে প্রায় অর্ধ মাস (পনেরো দিন) পুরো সেনাদল পেট ভরে তাদের আহারের চাহিদা মেটান।
মাছের বিশালতা ও আল্লাহর রহমত
এই ঘটনাটি সাহাবিদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ এক অলৌকিক রহমত ছিল। মাছটি আকারে এতটাই বিশাল ছিল যে, আবু উবাইদা (রা.) একপর্যায়ে ১৩ জন সাহাবিকে মাছটির একটিমাত্র চোখের কোটরে বসিয়ে দিতে পেরেছিলেন।
এ ছাড়া তিনি মাছটির পাঁজরের একটি বিশাল হাড় মাটি থেকে উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন এবং সেনাদলের সবচেয়ে বড় উটের পিঠে সওয়ারি বা হাওদা চাপিয়ে সেই দাঁড় করানো হাড়ের নিচ দিয়ে অনায়াসে পার করে দিয়েছিলেন।
নবীজি (সা.)-এর সম্মতি ও বরকত গ্রহণ
মদিনায় ফিরে আসার পর সাহাবিরা সমুদ্র থেকে পাওয়া সেই মৃত মাছ খাওয়ার বিষয়টি নবীজি (সা.)-কে অবগত করেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শোনামাত্র তা সানন্দে অনুমোদন দিয়ে বলেন, "তোমরা তা খাও। এটি তোমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পাঠানো রিজিক।"
কেবল অনুমোদনেই ক্ষান্ত হননি, নবীজি (সা.) সাহাবিদের কাছে সেই মাছের কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে কি না জানতে চান। পরে উপহার হিসেবে নিয়ে আসা সেই আম্বার মাছের অংশবিশেষ তিনি নিজেও বরকত হিসেবে আহার করেন।
সামুদ্রিক প্রাণী ও শরীয়তের বিধান
ইসলামি শরিয়তে সাধারণ মৃত প্রাণী খাওয়া হারাম হলেও সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বিধান রয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের জন্য দুটি মৃত জীব হালাল করা হয়েছে- মাছ ও টিড্ডি (একধরনের পঙ্গপাল)।’
পাশাপাশি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সমুদ্রের মর্যাদা ও এর প্রাণীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ এবং এর মৃত প্রাণী হালাল।’
আম্বার মাছের পরিচয়
হাদিসে উল্লিখিত এই বিশাল প্রাণীটিকে ‘আম্বার’ বলার দুটি কারণ গবেষকরা উল্লেখ করে থাকেন। প্রথমত, এই বিশেষ প্রজাতির তিমি থেকে বহুমূল্যবান ‘আম্বার’ নামক সুগন্ধিদ্রব্য তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, আরবি ভাষায় বিশাল মাথা ও দাঁতবিশিষ্ট বৃহদাকার দীর্ঘকায় তিমি মাছকে ‘আম্বার’ বলা হয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র: বুখারি: ৪৩৬২, মুসলিম: ১৯৩৫, তিরমিজি: ২৪৭৫, ইবনে মাজাহ: ৩২১৮, ফাতহুল বারি: ৮/৮০ (উৎস: নবীজির প্রিয় ১০০)


