

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে শুরু থেকেই ভারত নেতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে আসছে।
ভারতের এমন প্রতিক্রিয়ার ফলে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতের ‘অবশ্যই’ হাসিনাকে হস্তান্তর করা উচিত, এবং তাকে আশ্রয় দেওয়া ‘অবন্ধুসুলভ’ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু সে দাবি এবং প্রস্তাবনার ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও হাসিনার প্রত্যর্পণে ভারত এখনো পষ্ট করে কিছু বলছে না। এতে করে দুদেশের সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে বাংলাদেশের সামনে যে সমস্ত বাধা এবং আইনি জটিলতা দেখা দিয়েছে—
ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ২০১৬ সালে সংশোধন করা হয়। যদিও চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশ অপরাধীদের হস্তান্তর করতে পারে, তবুও এখানে ‘ডুয়াল ক্রিমিনালিটি’ বা উভয় দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার নীতি কার্যকর। হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো এই নীতি পূরণ করলেও চুক্তিতে ভারতের জন্য একাধিক ব্যতিক্রমী সুযোগ রয়েছে।
চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি প্রত্যর্পণকে ‘অন্যায় বা অত্যাচারমূলক’ বলে মনে হয়, তবে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতেই পারে। পাশাপাশি ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অপরাধে প্রত্যর্পণ নাকচ করা যেতে পারে। যদিও খুন, সন্ত্রাস বা আন্তর্জাতিক অপরাধগুলিকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে ধরা যাবে না—ফলে এই ধারায় ভারতের সুবিধা সীমিত। এছাড়া ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ভারত চাইলে নিজ দেশে বিচার পরিচালনার যুক্তিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
অনুপস্থিতিতে বিচারিক আদালত ও মৃত্যুদণ্ড
আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘অপিনিও জুরিস’ (Opinio Juris)-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা যেহেতু বাংলাদেশে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। তাই তাকে ফেরত দিলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সম্ভাবনা থাকায় ভারত মানবাধিকার ও আইনি নিশ্চয়তার প্রশ্ন তুলতে পারে। এ কারণে প্রত্যর্পণের আগে বাংলাদেশকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে হবে কি না—সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের আদালতে আইনি বাধা
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া রায় ভারতে সরাসরি কার্যকর হয় না। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব আইনি কাঠামো ও আদালতের প্রক্রিয়া বিবেচনায় আসবে। ফলে ঢাকার রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ একাই যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রত্যর্পণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমাদের আদালতই নেবে; এটি কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। ভারত খতিয়ে দেখবে—আদালতে যা প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা হলো, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভারতীয় আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।’
একই সাক্ষাৎকারে, কোনো আপস বা ছাড় দেওয়া ছাড়াই সমস্ত লক্ষ্য ও দাবি সম্পূর্ণরূপে আদায়ের প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে বলেও জানান সে কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, ভারত নিজে থেকে শেখ হাসিনাকে না পাঠাতে চাইলেও যদি তিনি নিজে থেকে আসতে চান তিনি আসতে পারবেন। এ বিষয়ে গত ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল কনফারেন্সে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। এ ব্যাপারে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ!’ কিন্তু ডিসেম্বরে ঠিক কোনদিন দেশে ফিরবেন, সে বিষয় অস্পষ্ট রেখে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। বিজয়ের দিন আমি দেশে ফিরতে চাই’।
শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যে নেটিজেনদের মাঝে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি এখন তার এই বক্তব্য অনুযায়ী আসলেও দেশে ফিরবেন কিনা—এ ব্যাপারে নানাজনের মনে নানা প্রশ্ন। কিন্তু ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল কনফারেন্সে তিনি সরাসরি ক্যামেরা সামনে না আসায় কেউ কেউ তার বেঁচে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে যেহেতু তিনি সরাসরি ক্যামেরার সামনে আসেননি, ধরে নেওয়া যায়, তিনি জীবিত নেই অথবা থাকলেও তার অবস্থা শোচনীয়।
এদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকায় গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পতিত শেখ হাসিনা প্রায় দুই বছর ধরে নয়াদিল্লির একটি অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয় ও নিরাপত্তা পেয়ে আসছেন।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যরা বলেছেন, ভারতে অনানুষ্ঠানিক আশ্রয়ে থাকাকালীন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দলীয় নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিলেন। তারা বলেন, তিনি সময়ে সময়ে সরাসরি বৈঠকও করেছেন এবং নিয়মিত টেবিল টেনিস খেলেছেন। তারা আরও জানান, ৭৮ বছর বয়সী এই নেত্রী বছরের শেষের দিকে ঢাকায় ফেরার পরিকল্পনা করছেন।


