

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আধুনিক শহুরে জীবনে পারিবারিক নেটওয়ার্ক ছোট হয়ে আসায় অনেকেই উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী খুঁজে পান না। এই শূন্যতা পূরণে অনলাইন ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
‘তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষদের বিয়ের ব্যবস্থা করো।’ (সূরা নূর, আয়াত: ৩২)
এই আয়াতটি ব্যক্তি নয়, বরং পরিবার ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে বলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- অনলাইনে জীবনসঙ্গী খোঁজার এই কাজটি কি ‘হালাল’ ?
এটি মূলত নির্ভর করে উদ্দেশ্য, কথাবার্তার ধরন এবং আপনি কোন মাধ্যম বা প্রক্রিয়া ব্যবহার করছেন তার ওপর।
১. ম্যাট্রিমনিয়াল ও ডেটিং অ্যাপের মূল পার্থক্য
ম্যাট্রিমোনিয়াল প্ল্যাটফর্ম এবং ডেটিং অ্যাপকে একই পাল্লায় মাপা ভুল।
ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট: এর মূল উদ্দেশ্য বিয়ে, যেখানে যোগাযোগ সাধারণত পরিবারের অভিভাবকত্বে এবং তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে হয়।
ডেটিং অ্যাপ: এর মূল বৈশিষ্ট্যই হলো গোপনীয়তা। সেখানে সম্পর্কের লক্ষ্য থাকে অনিশ্চিত এবং পরিবারের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না।
ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছে। নবীজি (সা.) এক সাহাবিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ না শুনে বললেন, ‘দেখে নাও। এটা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরিতে সহায়ক হবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৩৫)।
তবে এই দেখার প্রক্রিয়াটি গোপনে নয়, বরং পারিবারিক উপস্থিতিতে উন্মুক্তভাবে হওয়া উচিত।
২. ‘ডিজিটাল খালওয়াত’ বা গোপনীয়তার ঝুঁকি
ইসলামি বিধানে ‘খালওয়াত’ বা নির্জনে অপরিচিত নারী-পুরুষের একাকী অবস্থান নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে- তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩)
আধুনিক ফিকহবিদদের মতে, গভীর রাতে অভিভাবককে না জানিয়ে গোপন চ্যাট বা ভিডিও কল হলো এই সমস্যারই আধুনিক রূপ বা 'ডিজিটাল খালওয়াত'।
ছবি সংগৃহীত
গোপন সম্পর্ক সবসময়ই ক্রমশ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মানুষের আবেগীয় আসক্তি বাড়িয়ে বিচারবুদ্ধি দুর্বল করে দেয়।
৩. প্রোফাইলের মিথ্যাচার ও ইসলামের হুঁশিয়ারি
অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রায়ই ফিল্টার করা ছবি, সাজানো বিবরণ বা সরাসরি মিথ্যা তথ্য (যেমন: চাকরি, শিক্ষা বা পারিবারিক অবস্থা বাড়িয়ে বলা) দেখা যায়।
প্রতারণা সম্পর্কে নবীজি (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:
‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)
মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিয়ের সম্পর্ক শুরু থেকেই দুর্বল হয়। ইমাম ইবনে কুদামা তাঁর 'আল-মুগনি' গ্রন্থে লিখেছেন- বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করলে বা মিথ্যা বললে অপর পক্ষের চুক্তি বাতিলের অধিকার থাকে।
৪. সঙ্গী নির্বাচনের সঠিক মানদণ্ড
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘নারীকে সাধারণত চারটি কারণে বিয়ে করা হয়- সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও ধার্মিকতা। তুমি ধর্মভীরু নারী লাভ করে সফল হও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৯০)
এই নীতি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু সাধারণ ডেটিং অ্যাপের কাঠামোতে প্রথমেই গুরুত্ব পায় বাহ্যিক ছবি বা সৌন্দর্য, চরিত্র, ধার্মিকতা ও মূল্যবোধ সেখানে আড়ালে পড়ে যায়। এই উল্টো ক্রমটাই মূল সমস্যার জন্ম দেয়।
৫. নিরাপদ ও হালাল উপায়ে খোঁজার ৩টি নিয়ম
যদি আপনি অনলাইনেই জীবনসঙ্গী খুঁজতে চান, তবে শরিয়তের সীমানায় থাকতে এই নিয়মগুলো মেনে চলুন:
ইসলামিক মাধ্যম বেছে নেওয়া: সাধারণ ডেটিং অ্যাপের চেয়ে এমন প্ল্যাটফর্ম বেছে নিন যা বিশেষভাবে মুসলিমদের জন্য তৈরি এবং যেখানে অভিভাবকের নম্বর দেওয়া বাধ্যতামূলক বা চ্যাটিংয়ে থার্ড-পার্টি মডারেশন থাকে (যেমন: বিশ্বস্ত দ্বীনি ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট বা গ্রুপ)।
শুরুতেই পরিবারকে যুক্ত করা: কারো বায়োডাটা পছন্দ হলে নিজে বেশি দূর না এগিয়ে শুরুতেই আপনার বাবা-মা বা অভিভাবককে জানান এবং তাদের মাধ্যমে অপর পক্ষের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন।
ছবি ছাড়া বায়োডাটা আদান-প্রদান: প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য নাম-ছবি গোপন রেখে শুধু শিক্ষাগত ও পারিবারিক যোগ্যতা দিয়ে তৈরি বায়োডাটা ব্যবহার করা একটি চমৎকার ও নিরাপদ পদ্ধতি।
ছবি সংগৃহীত
মাধ্যমটি (অনলাইন) নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এর ব্যবহার পদ্ধতি। ছুরি দিয়ে যেমন ফলও কাটা যায়, আবার মানুষও জখম করা যায়- অনলাইন ম্যাট্রিমোনিও ঠিক তেমন।
সততা বজায় রেখে, ডিজিটাল খালওয়াত বা গোপনীয়তা পরিহার করে এবং পরিবারের অভিভাবকদের সাথে নিয়ে যদি এই মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, তবে তা অবশ্যই হালাল ও বৈধ। আপত্তি কেবল মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া এবং গোপনে সম্পর্ক গড়ে তোলার আধুনিক ফাঁদে পা দেওয়া নিয়ে।
