


নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ) পদ শূন্য হওয়ার পর নতুন নিয়োগকে ঘিরে ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। প্রশাসনিক দক্ষতা ও একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
গত ৭ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. হানিফ মুরাদ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদটি শূন্য হয়। এরপর থেকেই কে হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী ট্রেজারার—তা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে জোর আলোচনা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বিভিন্ন সময়ে তাদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শূন্য পদটি পূরণে ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। তার মধ্যে রয়েছেন বিএনপিপন্থী ২ অধ্যাপক এবং আওয়ামীপন্থী ২ অধ্যাপক। নতুন ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগের দৌড়ে এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চার শিক্ষকের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ফ্যাসিবাদের পক্ষাবলম্বন করা শিক্ষকদেরকে ঘিরে চলছে তুমুল সমালোচনা।
ট্রেজারার পদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিএনপিপন্থী শিক্ষকেরা হলেন জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার এবং ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন ও ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ।
অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি নোবিপ্রবির বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক। শিক্ষক রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই অধ্যাপক ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগের কো-অর্ডিনেটর এবং ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। তাঁর রয়েছে দীর্ঘ একাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। ফ্যাসিবাদী আমলে বিভিন্ন সময় জাতীয়তাবাদী বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, শিকার হয়েছেন নিপীড়ন ও বৈষম্যের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা-হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রামেও সরাসরি মাঠে থেকে তাদের সাহস জুগিয়েছেন।
ট্রেজারার পদে আলোচনায় থাকা বিএনপিপন্থী অপর শিক্ষক হলেন ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের (বিজনেস ফ্যাকাল্টি) ডিন এবং সাদা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. আবদুল কাইয়ুম মাসুদ। গবেষক হিসেবে অধ্যাপক ড. মাসুদের রয়েছে সুখ্যাতি এবং বিভিন্ন সময় স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন গবেষণা অ্যাওয়ার্ড। বিএনপিপন্থী শিক্ষক হওয়ায় ফ্যাসিবাদী আমলে শিকার হয়েছেন বৈষম্যের। তিনি জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের আজীবন সদস্য এবং ইউট্যাবেরও সদস্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষা ছুটিতে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও ছাত্র-জনতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে লেখনির মাধ্যমে আন্দোলনে সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন।
অপরদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন নোবিপ্রবি নীল দলের প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মহিনুজ্জামান এবং নীল দলের আরেক প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা হিসেবে পরিচিত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক।
অভিযোগ রয়েছে, ড. মহিনুজ্জামান নোবিপ্রবি নীল দলের ২০২৩-২৪ সেশনের অনুষদভিত্তিক কমিটির বিজ্ঞান অনুষদের আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য ছিলেন। বিগত শিক্ষক সমিতি নির্বাচনেও তিনি নীল দলের প্যানেলে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
শুধু তাই নয়, গত জুলাই বিপ্লবের চরম সহিংসতার সময়েও (১ আগস্ট) ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের পক্ষাবলম্বন করার ঘটনায় তিনি ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। এদিকে, ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্ট পদ থেকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আওয়ামীপন্থী এই শিক্ষক নেতা স্থানীয় সংসদ সদস্যের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে বর্তমান সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আলোচনায় থাকা আওয়ামীপন্থী অপর শিক্ষক হলেন অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউল হক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নীল দলের ২০২৩-২৪ কমিটির ব্যবসায় অনুষদের আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য হিসেবে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করেছেন। ভোগ করেছেন নানান সুযোগ-সুবিধা। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ডিগবাজি দিয়ে তিনি জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক এ পদে এমন বিতর্কিত শিক্ষক নেতাদের নিয়োগ-দৌড়ঝাঁপ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, হাজার প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এ বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের পক্ষের কোনো শক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার পদে দেখতে চান না তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনে থেকে নিজেদের জীবন বাজি রেখে যেসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই ট্রেজারার নিয়োগের দাবি তাদের। অন্যথায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে নোবিপ্রবির আঙিনা।