শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিয়ে না করে একা থাকছেন? দেখুন ইসলাম কী বলে

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ক্যারিয়ার গঠন কিংবা ভোগবাদী জীবনধারার প্রভাবে অনেক মানুষ বিয়ে থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেউ কেউ আজীবন অবিবাহিত থাকাকে ব্যক্তিগত পছন্দ বা আধুনিক জীবনধারার অংশ হিসেবেও দেখেন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে কী নির্দেশনা রয়েছে? বিয়ে না করলে কি গুনাহ হবে, নাকি এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

বিবাহ নবীদের সুন্নত

ইসলামে বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানবজীবনে শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিবাহের ব্যবস্থা করেছেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা আর-রূম : ২১)

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই আয়াত প্রমাণ করে যে বিবাহ শুধু জৈবিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি মানসিক প্রশান্তি, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়।

দ্বীনের পূর্ণতায় বিয়ের গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একটি হাদিসে তিনি বলেন,

“যখন কোনো বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। অতএব বাকি অর্ধেকের ব্যাপারে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।” (মুসতাদরাকে হাকেম : ২৭২৮, তাবারানি : ৯৭২)

আলেমদের মতে, বিবাহ মানুষের চরিত্র গঠন, দৃষ্টির সংযম, লজ্জাস্থানের হেফাজত এবং নৈতিক পবিত্রতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ইসলাম বিবাহকে উৎসাহিত করেছে এবং সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য তা বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করার নির্দেশ দিয়েছে।

আজীবন বিয়ে না করার চিন্তা কি ইসলামে সমর্থিত?

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে উৎসাহিত করে। অতিরিক্ত কঠোরতা কিংবা প্রকৃতিবিরোধী জীবনাচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, তিনজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইবাদত সম্পর্কে জানতে এসে নিজেদের জন্য অত্যন্ত কঠোর জীবনধারা নির্ধারণ করতে চাইলেন। তাদের একজন বললেন, তিনি কখনো বিয়ে করবেন না। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—

أَمَّا وَاللَّهِ إِنِّي لَأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، وَلَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ، وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي

‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং বেশি তাকওয়া অবলম্বন করি। কিন্তু আমি রোজাও রাখি, আবার না-ও রাখি; নামাজও পড়ি এবং বিশ্রামও করি; আর আমি নারীদের বিয়ে করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম ১৪০১, বুখারি ৫০৬৩)

এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইবাদতের নামে বিবাহকে পরিত্যাগ করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

বিয়ে না করলে কি গুনাহ হবে?

ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, বিয়ের হুকুম সব মানুষের জন্য এক নয়। ব্যক্তির অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এর বিধান ভিন্ন হতে পারে।

> যদি কারও মধ্যে প্রবল যৌন চাহিদা থাকে এবং গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব।

> যদি গুনাহের আশঙ্কা না থাকে, তবে বিয়ে করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।

> যদি কেউ আর্থিক, শারীরিক বা বিশেষ বাস্তব কারণে কিছু সময় বিয়ে করতে না পারে, তাহলে সে গুনাহগার হবে না।

> তবে আজীবন অবিবাহিত থাকার সংকল্প করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতকে অপ্রয়োজনীয় বা গুরুত্বহীন মনে করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

সুতরাং শুধু বিয়ে বিলম্বিত হওয়া বা কোনো কারণে কিছুদিন অবিবাহিত থাকা গুনাহ নয়। কিন্তু বিবাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা কিংবা সুন্নত থেকে বিমুখ হওয়ার মানসিকতা গ্রহণ করা অবশ্যই মুসলিমের জন্য শোভন নয়।

ইসলাম মানুষকে ফেরেশতা হতে বলেনি; বরং মানুষ হিসেবেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের শিক্ষা দিয়েছে। বিবাহও সেই সহজ ও স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থারই একটি অংশ। তাই ইসলাম ইবাদত, পরিবার, কাজ, বিশ্রাম ও সামাজিক দায়িত্ব— সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তিনি তোমাদের জন্য কঠোরতা চান না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৫)

বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, যা মানুষের চরিত্র, পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখে। বিয়ে মানুষের জীবনে প্রশান্তি, দায়িত্ববোধ এবং দ্বীনের পরিপূর্ণতা এনে দেয়। তাই সামর্থ্য ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ভোগবাদী চিন্তা বা সুন্নত থেকে বিমুখ হওয়ার মানসিকতায় আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে কোনো ব্যক্তি যদি বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বিয়ে করতে না পারেন বা কিছু সময় বিয়ে বিলম্বিত করেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন না। একজন মুমিনের উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতকে ভালোবাসা, সম্মান করা এবং সুযোগ ও সামর্থ্য হলে তা অনুসরণ করার আন্তরিক চেষ্টা করা। কেননা বিবাহ শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি ঈমান, চরিত্র ও মানবিকতার এক বরকতময় অধ্যায়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
USA VS Australia
Scheduled
20 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup