বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কি জাকাত ফরজ?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

জাকাত ইসলামের একটি ফরজ ইবাদত, যা নির্দিষ্ট সম্পদের মালিক হলে আদায় করা বাধ্যতামূলক। তবে অনেক মানুষের মনে প্রশ্ন থাকে—

যদি কেউ ঋণগ্রস্ত হয়, তাহলে তার ওপর কি জাকাত ফরজ হবে? ইসলামী শরিয়তে এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা বুঝলে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।

ইসলামে জাকাত ফরজ হওয়ার মূল শর্ত হলো, একজন ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে এবং সেই সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্র বছর তার মালিকানায় থাকবে।

আরও পড়ুনঃ ফিতরা কখন এবং কাকে দিতে হয়?

নিসাব বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, যেমন সাড়ে ৫২ তোলা রূপা বা তার সমমূল্যের টাকা-পয়সা। কিন্তু যদি কারো ওপর ঋণ থাকে, তাহলে সেই ঋণের বিষয়টি হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।

শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি তার মোট সম্পদ থেকে ঋণের পরিমাণ বাদ দিয়ে হিসাব করবে। অর্থাৎ প্রথমে দেখতে হবে, তার কাছে মোট কত সম্পদ আছে—নগদ টাকা, ব্যাংকের টাকা, স্বর্ণ, ব্যবসার পুঁজি ইত্যাদি

। এরপর সেই সম্পদ থেকে তার ওপর থাকা পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দিতে হবে। ঋণ বাদ দেওয়ার পর যদি অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণে পৌঁছে যায়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। আর যদি নিসাবের নিচে নেমে যায়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কারো মোট সম্পদ থাকে ৩ লক্ষ টাকা এবং তার ওপর ঋণ থাকে ২ লক্ষ টাকা, তাহলে প্রকৃত সম্পদ দাঁড়াবে ১ লক্ষ টাকা।

যদি এই ১ লক্ষ টাকা নিসাব পরিমাণের কম হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে না। কিন্তু যদি ঋণ বাদ দেওয়ার পরও তার সম্পদ নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি থাকে, তাহলে জাকাত দিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ ব্যাংকে জমানো টাকার জাকাত দেওয়ার নিয়ম।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ধরনের ঋণ একরকম নয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে যে ঋণ শিগগির পরিশোধ করা জরুরি, যেমন ব্যক্তিগত ঋণ, ব্যাংক ঋণ, দোকানের বাকি টাকা—এসব ঋণ সম্পদ থেকে বাদ দেওয়া যাবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, যা কিস্তিতে বহু বছর ধরে পরিশোধ করা হবে, সে ক্ষেত্রে শুধু চলতি বছরের বা নিকট ভবিষ্যতে পরিশোধযোগ্য অংশ বাদ দেওয়া হবে। পুরো ঋণ একসাথে বাদ দেওয়া যাবে না।

আরেকটি দিক হলো, কেউ যদি সম্পদশালী হয় কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ রেখে জাকাত না দিতে চায়, তাহলে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।

জাকাত থেকে বাঁচার জন্য কৃত্রিমভাবে ঋণ নেওয়া বা সম্পদ গোপন করা গুনাহের কাজ। কারণ জাকাত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি অধিকার, যা দরিদ্র মানুষের জন্য রাখা হয়েছে।

\হাদিসে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে। কুরআনে জাকাতের খাতের মধ্যে “ঋণগ্রস্ত” ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ-

যে ব্যক্তি ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং নিজের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম, সে জাকাত গ্রহণ করতে পারে। এতে বোঝা যায়, প্রকৃত ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় নিজেই জাকাতের যোগ্য হয়ে যায়, জাকাতদাতা নয়।

তবে যদি কেউ ঋণগ্রস্ত হলেও তার কাছে অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, যেমন দামি গয়না, জমি বা ব্যবসার বড় মূলধন, তাহলে সে সম্পদের ওপর জাকাত দিতে হবে।

কারণ ঋণ থাকা মানেই জাকাত মাফ হয়ে যায়—এমন নয়। আসল বিবেচ্য বিষয় হলো, ঋণ বাদ দেওয়ার পর তার হাতে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে কি না।

জাকাতের উদ্দেশ্য হলো সম্পদকে পবিত্র করা এবং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সাহায্য করা। একজন ব্যক্তি যদি সত্যিই ঋণের কারণে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে,

আরও পড়ুনঃ জাকাতের টাকা দিয়ে কি মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণ করা যাবে?

তাহলে তার ওপর জাকাতের বোঝা চাপানো ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শরিয়ত তাকে ছাড় দিয়েছে, যতক্ষণ না সে আবার নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়।

জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত ও সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি নিজের আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে যাচাই করে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

সন্দেহ থাকলে অভিজ্ঞ আলেম বা ইসলামী স্কলারদের পরামর্শ নেওয়া উত্তম, যাতে ভুল না হয়।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর জাকাত তখনই ফরজ হবে, যখন ঋণ বাদ দেওয়ার পরও তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকবে এবং সেই সম্পদ এক বছর পূর্ণ করবে।

আর যদি ঋণের কারণে তার সম্পদ নিসাবের নিচে নেমে যায়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ নয়; বরং সে নিজেই জাকাত পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। সঠিক হিসাব ও শরিয়তের নিয়ম অনুসরণ করাই এখানে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X