মঙ্গলবার
১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজার নিয়ত হিসেবে প্রচলিত বাংলা গজল বা ছড়া পড়া কি ঠিক?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১৬ এএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

রমজান মাস এলে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত বিষয় চোখে পড়ে—অনেকেই রোজার নিয়ত করার সময় নির্দিষ্ট কিছু বাংলা গজল বা ছড়া মুখস্থ করে পড়েন।

যেমন: “নাওয়াইতু আন আসূমা গাদান লিল্লাহি তাআলা…” কিংবা এর বাংলা ছন্দে তৈরি রূপ। অনেক পরিবারে শিশুদের রোজা শেখানোর সময়ও এই ছড়া শেখানো হয়।

ফলে মানুষের মনে ধারণা জন্মায় যে, এই ছড়া বা গজল না পড়লে রোজার নিয়তই হবে না। বাস্তবে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি কী?

রোজার নিয়ত হিসেবে এই ধরনের বাংলা ছড়া বা গজল পড়া কি সহিহ ও প্রয়োজনীয়, নাকি এটি শুধু প্রচলিত অভ্যাসমাত্র—এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরি।

আরও পড়ুনঃ রাসূল (সা.) রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি কোন দোয়াটি পড়তেন?

ইসলামে নিয়তের মূল অর্থ হলো অন্তরের সংকল্প বা সিদ্ধান্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।” এই হাদিসটি ইমাম বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নিয়ত কোনো নির্দিষ্ট বাক্য উচ্চারণের নাম নয়; বরং অন্তরে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই নিয়ত।

কেউ যদি মনে মনে এই সিদ্ধান্ত করে যে, আগামীকাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখবে, তাহলেই তার নিয়ত হয়ে যায়।

এর জন্য নির্দিষ্ট আরবি বা বাংলা বাক্য উচ্চারণ করা শরিয়তসম্মতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।

আরও পড়ুনঃ জিবরাঈল (আ.) এর ৩টি বদদোয়া: রমজান পেয়েও যাদের গুনাহ মাফ হলো না।

রোজার নিয়তের ব্যাপারে ফিকহবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, নিয়ত অন্তরের কাজ। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ (রহ.)—চার মাযহাবের সকল আলেম একমত যে, নিয়তের স্থান হলো হৃদয়।

মুখে উচ্চারণ করা সুন্নত বা ওয়াজিব নয়। বরং কেউ যদি মুখে কিছু না বলেও অন্তরে রোজার ইচ্ছা করে, তাহলেও তার রোজা সহিহ হবে। অতএব প্রচলিত বাংলা গজল বা ছড়া পড়া রোজা হওয়ার শর্ত নয়।

তবে প্রশ্ন হলো, এই ছড়া বা গজল পড়া কি ভুল বা বিদআত? এর উত্তর হলো—যদি কেউ এই ছড়া বা গজলকে নিয়তের শর্ত মনে করে, অর্থাৎ না পড়লে রোজা হবে না বলে বিশ্বাস করে, তাহলে তা ভুল আকিদা হবে।

কারণ শরিয়তে এমন কোনো নির্দিষ্ট ছড়া বা বাক্য নির্ধারণ করা হয়নি। কিন্তু যদি কেউ শুধু স্মরণ করার সুবিধার জন্য বা শিশুদের বোঝানোর উদ্দেশ্যে এই ধরনের ছড়া পড়ে,

এবং মনে রাখে যে আসল নিয়ত হলো অন্তরের সিদ্ধান্ত—তাহলে এতে গুনাহ নেই। এটি একটি শিক্ষামূলক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে একে সুন্নত বা আবশ্যক মনে করা যাবে না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম কখনো রোজার নিয়তের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ছড়া বা কবিতা পড়তেন—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই। তাঁরা সেহরি খেতেন এবং মনে মনে রোজার ইচ্ছা করতেন।

আরও পড়ুনঃ রোজাদারের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না: হাদিসের ব্যাখ্যা।

এটিই ছিল তাদের নিয়ত। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি ফজরের আগে রোজার নিয়ত করেনি, তার রোজা নেই।” এই হাদিসটি ইমাম আবু দাউদ ও তিরমিজি বর্ণনা করেছেন।

এখানে নিয়তের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো বাক্য বা দোয়ার কথা বলা হয়নি। অর্থাৎ সময়ের আগে অন্তরে সিদ্ধান্ত থাকাই যথেষ্ট।

আমাদের সমাজে প্রচলিত ছড়া বা গজলের মূল সমস্যা হলো—অনেকে এটাকে ধর্মের অংশ মনে করে বসে। কেউ যদি ভুলে এই ছড়া না পড়ে, তখন ভয় পায় যে তার রোজা হয়নি।

অথচ বাস্তবে তার অন্তরে যদি রোজার নিয়ত থাকে, তবে তার রোজা সম্পূর্ণ সহিহ। তাই আলেমদের মতে, মানুষকে শেখানো উচিত যে নিয়ত মানে মুখস্থ ছড়া নয়, বরং অন্তরের ইচ্ছা ও প্রস্তুতি।

ইসলামে সহজতা ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।”

এই আয়াত সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৫-এ এসেছে, যা রোজার বিধানের মধ্যেই উল্লেখিত। অতএব রোজার নিয়তকে কঠিন বানিয়ে নির্দিষ্ট ছড়া বা গজলের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া ইসলামের এই মূলনীতির পরিপন্থী।

সবশেষে বলা যায়, রোজার নিয়ত হিসেবে প্রচলিত বাংলা গজল বা ছড়া পড়া শরিয়তের আবশ্যক কোনো বিধান নয়। নিয়ত মূলত অন্তরের কাজ।

কেউ চাইলে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বা অভ্যাসগতভাবে এই ছড়া পড়তে পারে, তবে একে সুন্নত বা ফরজ মনে করা যাবে না। সঠিক পদ্ধতি হলো—

ফজরের আগে অন্তরে দৃঢ়ভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, আগামীকাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখব। এটুকুই রোজার নিয়তের জন্য যথেষ্ট এবং এটিই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS Senegal
Scheduled
17 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup