

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাস আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর কাছে মিনতি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গভীর ও নিয়মিত ছিল।
সাহাবায়ে কেরাম লক্ষ্য করেছেন, রমজানে নবীজি শুধু নামাজ, রোজা ও কুরআন তিলাওয়াতেই ব্যস্ত থাকতেন না; বরং তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন দোয়াকে। কারণ দোয়া হলো ইবাদতের মূল এবং বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম।
হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে একটি দোয়াকে বিশেষভাবে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই দোয়াটি হলো ক্ষমা ও মাগফিরাত চাওয়ার দোয়া। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে, লাইলাতুল কদরের সম্ভাব্য রাতগুলোতে তিনি যে দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন, তা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে সহিহ সনদে বর্ণিত।
আরও পড়ুনঃ ঈদের নামাজের তাকবীরে তাহরিমা ও ছানা পড়ার নিয়ম।
তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই, তাহলে আমি কী দোয়া পড়ব? তখন তিনি বললেন, তুমি এই দোয়া পড়বে— “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওয়ুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।”
এই দোয়াটির অর্থ অত্যন্ত গভীর। এর অর্থ হলো, হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দাও। আলেমগণ বলেন, এই দোয়াটি শুধু লাইলাতুল কদরের জন্য নয়; বরং পুরো রমজান মাসের দোয়ার সারসংক্ষেপ।
কারণ রমজানের মূল উদ্দেশ্যই হলো গুনাহ থেকে মুক্তি ও আল্লাহর ক্ষমা লাভ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন এই দোয়াটিকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন, তা বুঝতে হলে রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হবে।
রমজান এমন একটি মাস, যেখানে বান্দা নিজের অতীত গুনাহের বোঝা নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। নবীজি উম্মতকে শেখাতে চেয়েছেন যে, সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো গুনাহ মাফ হওয়া। সম্পদ, সুস্থতা বা দুনিয়াবি সফলতার চেয়েও আল্লাহর ক্ষমা অনেক বড় নিয়ামত। তাই তিনি রমজানে সবচেয়ে বেশি যে দোয়াটি পড়তেন, সেটি ক্ষমা চাওয়ার দোয়া।
আরও পড়ুনঃ ঈদুল ফিতরের দিনের বিশেষ দোয়া ও জিকির (তাকবীরে তাশরিক)।
হাদিসে আরও দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানে দোয়ার সময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। তিনি নিজে যেমন এই দোয়া পড়তেন, তেমনি সাহাবিদেরও তা শেখাতেন। আলেমদের মতে, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওয়ুন…” দোয়াটি এমন একটি দোয়া, যেখানে আল্লাহর গুণবাচক নাম, তাঁর ভালোবাসা এবং বান্দার অসহায়ত্ব—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এসেছে। এ কারণে এই দোয়া দ্রুত কবুল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
রমজানের শেষ দশকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবাদতে আরও বেশি মনোযোগী হতেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, তিনি এই সময় কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।
এই ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, রমজানের চূড়ান্ত অর্জন হলো আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমার ঘোষণা পাওয়া।
এই দোয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে শুধু ক্ষমা চাওয়া হয়নি; বরং আল্লাহর গুণের মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। আল্লাহ আফুওয়ুন, অর্থাৎ তিনি এমনভাবে ক্ষমা করেন যে, গুনাহের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকে না। আলেমগণ বলেন, সাধারণ মাগফিরাতের তুলনায় ‘আফও’ আরও ব্যাপক।
আরও পড়ুনঃ ঈদের দিনে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোর সুন্নাহ দোয়া।
তাই নবীজি এই শব্দটি ব্যবহার করতে শিখিয়েছেন। রমজানে এই দোয়াটি শুধু মুখে পড়লেই যথেষ্ট নয়; বরং অন্তর থেকে অনুতাপ ও সংশোধনের নিয়ত থাকা জরুরি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে গুনাহমুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই দোয়া বেশি বেশি পড়তেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন, গুনাহ না থাকলেও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং বিনয়ী থাকতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি যে দোয়াটি পড়তেন, তা হলো ক্ষমা চাওয়ার দোয়া— “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওয়ুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।” এই দোয়াই রমজানের মূল চেতনা ধারণ করে।
যদি একজন মুমিন রমজান মাসে এই দোয়াটি বারবার পড়ে, অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন এবং নতুন জীবন শুরু করার তাওফিক দান করেন—ইনশাআল্লাহ।
মন্তব্য করুন

