

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের এক বিশেষ দিন। রমজান বা কুরবানির মতো বড় ইবাদতের পর আল্লাহ তাআলা ঈদের মাধ্যমে বান্দাদের জন্য খুশি প্রকাশের সুযোগ দেন। তবে ইসলামে ঈদের আনন্দও নিয়ন্ত্রিত ও ইবাদতকেন্দ্রিক।
খাওয়া-দাওয়া, সাক্ষাৎ, উপহার দেওয়া—সবকিছুর পাশাপাশি ঈদের দিনে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোও একটি সুন্দর সুন্নাহভিত্তিক আমল। এই শুভেচ্ছার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ভালোবাসা, দোয়া ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ঈদের দিনে শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
হাদিসে বর্ণিত আছে, সাহাবিরা ঈদের দিন একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে দোয়ার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতেন। বিখ্যাত সাহাবি হজরত জুবাইর ইবনু নুফাইর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা ঈদের দিনে পরস্পর সাক্ষাৎ করলে বলতেন, “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।”
আরও পড়ুনঃ সিজদায়ে তিলাওয়াত: কুরআনের সিজদার আয়াতে কী দোয়া পড়তে হয়?
এই বর্ণনাটি ইমাম বায়হাকি ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন এবং বহু আলেম এটিকে হাসান সনদের আমল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এই দোয়াটির অর্থ অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” অর্থ হলো—আল্লাহ আমাদের এবং তোমাদের কাছ থেকে কবুল করুন। অর্থাৎ, ঈদের শুভেচ্ছার মধ্যেই ইবাদত কবুল হওয়ার দোয়া যুক্ত রয়েছে। একজন মুসলমান অন্য মুসলমানকে শুধু আনন্দই জানাচ্ছে না, বরং তার রোজা, নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদত আল্লাহ যেন কবুল করেন—এই দোয়াও করছে।
এটি ইসলামের সৌন্দর্য ও আত্মিক গভীরতার এক অনন্য উদাহরণ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে এই দোয়াটি সরাসরি বলেছেন—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই। তবে সাহাবিদের ধারাবাহিক আমল থেকে প্রমাণিত হওয়ায় আলেমগণ এটিকে সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ইসলামী শরিয়তে সাহাবিদের সম্মিলিত ও প্রসিদ্ধ আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ঈদের দিনে এই দোয়াটি বলা সুন্নাহসম্মত এবং বরকতময়।
আরও পড়ুনঃ ঈদের নামাজের তাকবীরে তাহরিমা ও ছানা পড়ার নিয়ম।
ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রে ইসলাম কোনো কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেনি। মূল উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা প্রকাশ, সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং দোয়ার মাধ্যমে একে অপরের কল্যাণ কামনা করা। তাই “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” বলার পাশাপাশি কেউ যদি অর্থ বুঝে বাংলায় বলে, “আল্লাহ আপনার ইবাদত কবুল করুন”—তাতেও কোনো সমস্যা নেই।
তবে আরবি দোয়াটি বললে সুন্নাহর অনুসরণ করা হয় এবং এর ফজিলতও বেশি আশা করা যায়। ঈদের দিনে শুভেচ্ছা জানানো শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সঙ্গে হাসিমুখ, কুশল বিনিময় ও আন্তরিকতা যুক্ত থাকা জরুরি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন এবং মুসলমানদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন।
ঈদের দিনে এই সুন্নাহ আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ ঈদের দিন অনেক মানুষের অন্তরে আনন্দের পাশাপাশি কিছু কষ্টও থাকতে পারে। একটি আন্তরিক দোয়া ও শুভেচ্ছা সেই কষ্ট লাঘব করতে পারে।
ঈদের দিনে শুভেচ্ছা জানানোর সময় গুনাহমুক্ত ভাষা ব্যবহার করাও জরুরি। ইসলাম এমন কোনো শুভেচ্ছাকে সমর্থন করে না, যেখানে গুনাহ, অহংকার বা অপচয়ের বিষয় জড়িত থাকে। বরং দোয়া, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর স্মরণ—এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই ঈদের শুভেচ্ছা হওয়া উচিত। এই কারণেই সাহাবিদের শেখানো দোয়াটি সবচেয়ে উত্তম ও ভারসাম্যপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ কুরআন খতম দেওয়ার পর যে দোয়া পড়তে হয় (খতমে কুরআনের দোয়া)।
বর্তমান সময়ে অনেকেই ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে বিভিন্ন বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। এসব বাক্য শরিয়তবিরোধী না হলে সমস্যা নেই। তবে যদি কেউ সুন্নাহর প্রতি আগ্রহী হয় এবং ইবাদতের সওয়াব অর্জন করতে চায়, তাহলে ঈদের দিনে সাক্ষাৎ বা বার্তা আদান-প্রদানের সময় “তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম” বলা তার জন্য উত্তম হবে।
সবশেষে বলা যায়, ঈদের দিনে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং এটি একটি ইবাদতসম আমল, যদি তা দোয়া ও সুন্নাহর অনুসরণে করা হয়। সাহাবায়ে কেরামের শেখানো এই দোয়াটি ঈদের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈদের দিনে পরস্পরের জন্য আন্তরিক দোয়া করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের ইবাদত কবুল করে নিন—আমিন।
মন্তব্য করুন

