


দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে সম্প্রতি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ এবং সংঘর্ষের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
ক্যাম্পাসে এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবির বলছে, পুরোনো ধারার রাজনীতিতে ফিরতে চায় ছাত্রদল। তাদের অভিযোগ, মেধার পরিবর্তে আবারও পেশিশক্তির রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে চাইছে ছাত্রদল, যা মানবে না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শিবির ক্যাম্পাসে সহ-অবস্থানের রাজনীতি চায়।
ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসগুলোয় দেশীয় অস্ত্রের মহড়া চালাচ্ছে ছাত্রশিবির। পাশাপাশি হামলা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছেন ছাত্রদলের নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সেই চিত্র ক্যাম্পাসে কেউ দেখতে চায় না। অচিরেই সরকারের এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এর পরিণতি বেশি ভালো হবে না।
এদিকে, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকার ও ছাত্রদলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে ছাত্রশিবির। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে সংগঠনটির দাবি, এর ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
রাজধানীতে মঙ্গলবার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন ছাত্রদল ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটাই দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো সংঘর্ষ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপুরে দিকে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা কলেজ ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায়। তিন জায়গায় সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
গত বুধবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে গেল সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও (বেরোবি) ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরপর তিনদিন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল, শিবির, ছাত্র শক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। এতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো ছাত্রলীগের দখলে ছিল। ছাত্রদল ও শিবির প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে গেলে হামলার শিকার হতো। বর্তমানে আওয়ামী লীগের এ ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘স্বাভাবিক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাসে চায় ছাত্রদল। কেউ যদি স্থায়ীভাবে পরিস্থিতি জটিল করতে চায় তাহলে এর দায় তাদেরই নিতে হবে। এখন পরিস্থিতি ইতিবাচক মনে হচ্ছে, সহনশীল আচরণই আমরা করছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে নাছির বলেন, ‘এই বাস্তবতার ক্ষেত্রে অন্যরাই লাভবান হবে বলা যায়। কেউ পরিস্থিতি জটিল করলেও স্থিতিশীল রাখার জন্য ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য আমরা ইতিবাচক।’
বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এনপিবি নিউজকে বলেন, পুরানো যে আধিপত্য বিস্তার, হল-ক্যাম্পাস দখল, ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের দিকেই রাজনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে ছাত্রদল। প্রতিটি ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এই রাজনীতি পরিহার করেছে। কিন্তু ছাত্রদল আবার সেই উত্তপ্ত রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ছাত্রদল এই অবস্থা থেকে ফিরে না আসলে প্রতিটি ক্যাম্পাসে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হবে। আমরা চেষ্টা করছি ক্যাম্পাস শান্ত রাখার জন্য। এটা আমাদের কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার)।
ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস শান্ত রাখার চেষ্টা করছে দাবি করে তিনি বলেন, তাদের (ছাত্রদল) হাইকমান্ড থেকে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছি আমরা ক্যাম্পাসে সহ-অবস্থানের রাজনীতি চাই। ক্যাম্পাসে আমরা শিক্ষার্থী বান্ধব কার্যক্রম করবো। অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন বা দলীয় লেজুড়বৃত্তি কোনো কাজ ক্যাম্পাসে হবে না, ক্যাম্পাস হবে সবার জন্য।
তিনি আরও বলেন, ‘হল দখল, গণরুম, গেস্ট রুম কালচার আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই না। ক্যাম্পাস স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখার জন্য ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ যাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে তাদেরকে জানানো হয়েছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী এনপিবি নিউজকে বলেন, ক্যাম্পাসে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এটা কমানোর দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রদলের। আবার ক্যাম্পাসে অস্থিরতা, হল দখল শুরু হয়েছে তাহলে কি সেই আওয়ামী লীগের, ছাত্রলীগের একই চিত্র দেখতে যাচ্ছি। অচিরেই সরকারের এই পরিস্থিতি বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এর পরিণতি বেশি ভালো হবে না।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতিতে হলে লাভবান হবে ভারত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ। বিএনপির উচিত ছাত্রদল এবং যুবদলকে নিয়ন্ত্রণ করা। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকেই আটক করা হয়নি বলে জানান দিলারা চৌধুরী।