মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সমস্যা এ সরকারের সৃষ্টি নয়: বিরোধীদলীয় নেতা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৬ পিএম আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

দেশের চলমান জ্বালানি সংকট বর্তমান সরকারের সৃষ্টি নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে তিনি বলেছেন, সরকার সংকট সমাধানে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলেও জনগণের দুর্ভোগ দিন দিন কমছে না, বরং বাড়ছে।

সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানি সংকট দীর্ঘদিনের এবং ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়ে এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশ সবার, তাই দেশের সংকট সমাধানে যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে মূলত তিন ধরনের গ্রাহক রয়েছেন। বড় একটি অংশ হলো ডোমেস্টিক বা গৃহস্থালি গ্রাহক, যারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। দ্বিতীয়টি হলো কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক গ্রাহক। আর তৃতীয়টি হলো তুলনামূলকভাবে বিশেষায়িত ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রাহক, যারা শিল্প খাতে রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, গত তিন বছরে এ সংকটের কারণে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, এসব কারখানার ৪০০ বা তার বেশি উদ্যোক্তা, কিংবা সংশ্লিষ্ট গ্রুপের উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে না পারায় তারা ঋণখেলাপি হয়েছেন। একজন ঋণখেলাপি হলে তিনি অন্য কোনো ব্যাংক থেকেও নতুন করে ঋণ নিতে পারেন না। ফলে তার পুরো ব্যবসার চাকা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এর সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের বিষয়টি জড়িত। যখন জ্বালানির অভাবে কারখানার উৎপাদন কমে যাবে- সম্প্রতি এর একটি উদাহরণ দেয়া যায়। বিজিএমইএর বর্তমান কমিটির একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে তাদের উদ্বেগ ও দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে বর্তমানে উৎপাদন ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।

‘উৎপাদন যদি ৫০ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে কারখানাগুলো বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারবে না। ক্রেতারাও দীর্ঘদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না; তারা বিকল্প উৎস খুঁজে নেবে। একবার তারা অন্য উৎসে চলে গেলে আবার ফিরে আসাটাও সহজ নয়। এ কারণে আমরা একদিকে রপ্তানি হারাচ্ছি, অন্যদিকে শিল্পকারখানা চালাতে না পারায় মালিকদের বাধ্য হয়ে শ্রমিক ছাঁটাই করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় তা করতে হয়েছে।

জামায়াত আমির বলেন, ‘এমনকি নাম উল্লেখ না করেই বলতে চাই, এই সংসদেও অনেক শিল্প উদ্যোক্তা বা মালিক রয়েছেন, যারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারাও নিজেদের কারখানা থেকে বাধ্য হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেছেন। এটি তাদের ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত নয়; বরং একান্ত অপারগতার কারণে তারা কারখানা চালাতে পারছেন না। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে শিল্প খাতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ- এই তিনটি বিষয় দেখি, তাহলে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চারটি প্রধান উৎসে মোট সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু গত আগস্টের তথ্য যদি দেখি, তাহলে দেখা যাবে, আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে আমাদের ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। তাহলে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা যখন চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি, এরপরও কেন ঘাটতি হচ্ছে- এটি একটি বড় প্রশ্ন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এর উত্তর হলো, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় উৎপাদন করতে পারছে না, সরবরাহও করতে পারছে না। তারা কেন পারছে না? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে তাদের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে। কিন্তু তাদের হাতে সেই অর্থ তুলে দেয়া যাচ্ছে না। তারা যদি টাকা না পায়, তাহলে উৎপাদনের চাকা চালু রাখবে কীভাবে? তাদের অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে? স্বাভাবিকভাবেই এখানে একটি বড় প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। এই ৫৯ হাজার কোটি টাকা গত ছয় মাসের হিসাব নয়। অতীত থেকে চলে আসা বকেয়া ক্রমাগত জমে এর পরিমাণ এত বড় হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি উৎপাদনের মূল উৎস হলো গ্যাস। এরপর রয়েছে তেল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি। এছাড়া আমাদের ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে বড়পুকুরিয়া নিজেদের উত্তোলিত কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সেখানে তাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কয়লা উত্তোলন হয়। আমরা দেখেছি, বিগত সরকারের সময়ে সেখান থেকে হাজার হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে গেছে। এর কোনো জবাবও পাওয়া যায়নি—কোথায় গেল সেই কয়লা? যেহেতু সেখানে অতিরিক্ত কয়লা রয়েছে, সেটি দিয়ে অন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যাকআপ দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা এ নিয়ে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা কারিগরি সমীক্ষা হয়েছে কি না- তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।’

বিরোধীদলের এই নেতা বলেন, ‘গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা মূলত দুটি উৎস থেকে গ্যাস পেয়ে থাকি। একটি হলো দেশিয় উৎস, অন্যটি আমদানি করা গ্যাস। একসময় আমদানি করা গ্যাসের পরিমাণ ছিল ২০ শতাংশ, আর ৮০ শতাংশ আসত দেশিয় উৎস থেকে। কিন্তু এখন আমদানি নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। এর কারণ হলো, আমাদের গ্যাসকূপগুলো এখন আগের মতো চাপ বজায় রেখে গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। আবার নতুন কূপ থেকে গ্যাস আহরণ ও উত্তোলনের জন্য যে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, সেটিও দীর্ঘদিন নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্যাস উত্তোলনের কার্যক্রম মূলত অনশোর বা স্থলভিত্তিক। অফশোরে এখন পর্যন্ত আমরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারিনি। অথচ পাশের দেশগুলো একই সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে এবং এর সুফল পাচ্ছে। আমরা কেন থমকে আছি? কোথায় আমাদের হাত-পা বাঁধা? যদি কোথাও বাধা থাকে, তাহলে সেই বাধা দূর করতে হবে।

নিজেদের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই খনিজ সম্পদ আল্লাহর দান। এটি আমাদের অধিকার এবং একই সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank