মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৪ পিংক বাসের অর্ধেকেরই আয়ুষ্কাল শেষ, মাসে লোকসান ১২ লাখ টাকা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
expand

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গত ১৮ আগস্ট চালু হয় ‘পিংক বাস’ সার্ভিস। এদিন রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ তথা ‘পিংক বাস সার্ভিস’ উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

বিশেষ এই বাস সার্ভিস নারীচালক ও নারী কন্ডাক্টরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রুটে ১০টি বাস দিয়ে এ সেবা শুরু করা হয়। এর বাইরে বগুড়ায় দুটি এবং চট্টগ্রামে দুটি বাস চালু হয়। তিন শহরে মোট ১৪টি গোলাপি রঙের বাস দিয়ে শুরু হয়েছে নারীদের জন্য এ বিশেষ বাস সার্ভিস।

উদ্বোধনের দিন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয় ‘পিংক বাস’। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই ভেসে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে সর্বপরি নারীদের নিরাপত্তায় সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগ ভূয়সী প্রশংসাই পেয়েছে।

কিন্তু মাস না যেতেই এই বাস সার্ভিসের বিষয়ে উঠে এসেছে এমন সব তথ্য - যা উদ্যোগটিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।

গণমাধ্যমের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে - ১৪টি পিংক বাসের ৬টিরই নেই আয়ুষ্কাল; বাকি ৮টি বাসের আয়ুষ্কাল রয়েছে মাত্র ৫ বছর। পুরোনো বাসে নতুন রঙ ও মোড়ক দিয়ে সড়কে নামানো হয়েছে। আর এই সাভির্স চালাতে গিয়ে মাসে লোকসান গুণতে হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) নথিতে দেখা যায় ‘নারায়ণগঞ্জ-ব-১১-০০৮৪’ বাসটি ২০১১ সালের তৈরি; যার আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১৫ বছর। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সনদ ইস্যু হয় ২০১১ সালের ২০ নভেম্বর। অর্থাৎ ২০২৬ সালে এসে এই বাসের আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। সেই বাসকেই নতুন রং আর মোড়ক দিয়ে নামানো হয়েছে সড়কে।

নারীদের নিরাপত্তার জন্য যে বাসের বহর তার প্রায় অর্ধেকেরই নেই আয়ুষ্কাল। তথ্য অনুযায়ী, ১৪টি পিংক বাসের ৬টিরই ১২ বছরের আয়ুষ্কাল শেষ। বাকি ৮টি বাসের আয়ুষ্কাল আছে মাত্র ৫ বছর।

আয়ুষ্কাল ফুরানো এই বাস চলছে লোকসানে। নথির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ ও ৩০ আগস্ট দেশের ১০টি ডিপো থেকে ১৪ পিংক বাস মাত্র ৩০টি ট্রিপ দেয়। এতে বিক্রি হওয়া ১৭৯২টি টিকিট থেকে আয় হয়েছে ২৭ হাজার ৪২ টাকা। কিন্তু এই দুই দিনে জ্বালানি, টোল, বেতন অন্যান্য বাবদ খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। অর্থাৎ লোকসান হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা। এ হিসেবে একদিনে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার টাকায়।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, পিংক বাসের আয়ুষ্কাল শেষের যে অভিযোগ উঠেছে, এতে এমন একটা উদ্যোগ হোঁচট খেয়েছে। চাহিদার সঙ্গে যোগানের সমন্বয় করে আরও পরিকল্পিতভাবে যদি উদ্যোগটা চালু করতে পারতাম, তাহলে এই বাস সার্ভিস টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো।

বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে পিংক বাস সার্ভিস ফলপ্রসু উদ্যোগে রূপ নেবে বলে মত তার।

তিনি জানান, সরকার রুট নির্ধারণ করাসহ অবকাঠামোগত সাপোর্ট দেবে। বাস স্টপেজ, কাউন্ডার ও টিকিটিং সিস্টেমটা মেনটেইন করবে। এদিকে বেসরকারিভাবে আরও বাস যুক্ত করতে হবে। কারণ, তাদের মাথায় ব্যথা থাকবে কীভাবে সেবা দিয়ে উদ্যোগটি ধরে রাখতে হবে। শুধুমাত্র বিআরটিসির ডাবল ডেকার দিয়ে এই সার্ভিসে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সম্ভব নাও হতে পারে।

পিংক বাস সার্ভিসে আয়ুষ্কালহীন বাস চালুর বিষয়টি স্বীকারে করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, ‘২০১৮ ও ১০১৯ সালের পর আমার বহরে কোনো নতুন গাড়ি আসেনি। এটা সরকারের সর্বোচ্চ মহল পর্যন্ত জানেন।’

তাহলে সড়কে কেন এমন বাস নামানো হলো প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রয়োজনের খাতিরে এ গাড়িগুলো চালু করা হয়েছে। আবার যখন নতুন বাস আসবে তখন রিপ্লেসমেন্ট করে ফেলব।

লোকসানের বিষয়টিও স্বীকার করেন আব্দুল লতিফ মোল্লা। বিআরটিসির চেয়ারম্যান বলেন, লাভে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ব্যর্থ হলে ফের টাকা চাওয়া হবে সরকারের কাছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগটি প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচক হলেও বাসের মান, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিচালনাগত দক্ষতা নিশ্চিত না করে শুধু নতুন নামে পুরোনো বাস নামানো হলে উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হলে শুধু বাসে নারীচালক ও নারী কন্ডাক্টর নিয়োগ করাই যথেষ্ট নয়। বাসের ফিটনেস, বয়স, যান্ত্রিক সক্ষমতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রী সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া বাস ব্যবহার করলে মাঝপথে বিকল হওয়া বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে যে সেবা নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার কথা, সেটিই উল্টো অনিরাপত্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাদের মতে, একটি গণপরিবহন সেবার ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছে নিরাপত্তার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্যতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো বাস বারবার বিকল হলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হবে এবং ধীরে ধীরে যাত্রীদের মধ্যে এই সেবার প্রতি আস্থা কমে যাবে।

তথ্যসূত্র: স্টার নিউজ

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank